প্রস্তর যুগ STONE AGE

প্রস্তর যুগ STONE AGE হলো মানব ইতিহাসের এমন এক পর্যায় যখন মানুষ পাথর ব্যবহার করে হাতিয়ার তৈরি করত এবং এর মাধ্যমে শিকার, খাদ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য কাজ করত। এই যুগটি প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন বছর ধরে চলেছিল এবং ধাতুর কাজের সূত্রপাত হওয়ার সাথে সাথে এর সমাপ্তি ঘটে, যা মানব সমাজের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রস্তর যুগকে সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাচীন প্রস্তর যুগ, মধ্য প্রস্তর যুগ এবং নব্য প্রস্তর যুগ।  

READ MORE – প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

প্রস্তর যুগ STONE AGE

প্রস্তর যুগকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়? বিভিন্ন ভাগের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।

উত্তর:-

• প্রস্তর যুগ:-

এককোশী অ্যামিবা থেকে দীর্ঘ বিবর্তনের যাত্রাপথ অতিক্রম করে পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব ঘটে। আজ থেকে অন্তত ১০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে ‘হোমো ইরেক্টাস’ নামে মেরুদণ্ডী মানুষের আবির্ভাব ঘটে বলে জানা যায়। পূর্ব-আফ্রিকায় এরকম আদিম মানুষের কঙ্কালের হদিস পাওয়া গেছে। এরপর একাধিক স্তর অতিক্রম করে ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা আজকের মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে।

• শ্রেণিবিভাগ:-

বিবর্তনের পথ ধরে জুরাসিক যুগ, তুষার যুগ প্রভৃতি অতিক্রম করে মানুষ এক সময় প্রস্তর যুগে (Stone Age) এসে পৌঁছোয়। প্রস্তর যুগে মানুষ পাথরের তৈরি বিভিন্ন হাতিয়ার ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার হরত। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২,৬০,০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ অব্দ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়কালকে প্রস্তর যুগ কুয়েতে আনা হয়। পাথরের হাতিয়ারগুলির গঠন প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদগণ প্রস্তর যুগের এই দীর্ঘ সময়কালকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা- (1) পুরাতন প্রস্তর যুগ, (2) মধ্য প্রস্তর যুগ ও (3) নব্য প্রস্তর যুগ।

[1] পুরাতন প্রস্তর যুগ (Palaeolithic Age):-

পুরাতন প্রস্তর যুগের প্রথমদিককার ইতিহাসের অধিকাংশই অজানার অন্ধকারে ঢাকা। তবে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ পুরাতন প্রস্তর যুগের সময়কাল হিসেবে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২,৬০,০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ বা ৮,০০০ অব্দকে চিহ্নিত করে থাকেন। ভারতের পাল্লাবের সোয়ান নদীর অববাহিকা, মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) পুরাতন প্রস্তর যুগের বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া গেছে।

এই দুটি সংস্কৃতি যথাক্রমে ‘সোয়ান-সংস্কৃতি’ ও ‘মাদ্রাজ সংস্কৃতি’ নামে পরিচিত। ইতিহাসবিদরা অনুমান করেন, নেগ্রিটো জাতির মানুষরাই হল ভারতের প্রাচীনতম অধিবাসী। তাদের তৈরি হাতিয়ারগুলি ছিল পাথরের তৈরি এবং অমসৃণ। হাতিয়ারগুলির আকৃতি ছিল বিরাট। এ যুগের অন্যতম হাতিয়ার ছিল পাথরের তৈরি হাত-কুঠার। এ ছাড়া, পাথর দিয়ে তারা বর্শা, ছুরি, অন্যান্য হাতিয়ার এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করত। তারা খাদ্য উৎপাদন করতে পারত না, তারা ছিল খাদ্য সংগ্রহকারী। তারা আগুনের ব্যবহারও জানত না। তারা গাছের ছাল ও পশুর চামড়া পরত। এই যুগের শেষের দিকে বিভিন্ন চিত্রের মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে শেখে।

[2] মধ্য প্রস্তর যুগ (Mesolithic Age):-

পুরাতন প্রস্তর যুগের অবসানের পর শুরু হয় মধ্য প্রস্তর যুগ। এই যুগের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ১০,২০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫,০০০ অব্দ। এই যুগের শেষদিকে মানুষ খাদ্য উৎপাদন, মৃৎশিল্প, ফাঁদ পেতে শিকার ধরা প্রভৃতি আয়ত্ত করে। মাটির জিনিসপত্র তৈরিতে কুমোরের চাকার ব্যবহার তখনও শুরু হয়নি। তাই মাটির জিনিসপত্রগুলি হাতে তৈরি করা হত। পাথরের হাতিয়ারগুলির আকৃতি এই সময় ছোটো হয়ে আসে। এই যুগে মেয়েরা বীজ বুনে শস্য উৎপাদনের কৌশল আবিষ্কার করেছিল। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অস্ত্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, তামিলনাড়ু প্রভৃতি বিভিন্ন রাজ্যে মধ্য প্রস্তর যুগের নিদর্শন মিলেছে।

[3] নব্য প্রস্তর যুগ (Neolithic Age):-

মধ্য প্রস্তর যুগের অবসানের পর মানুষের তৈরি পাথরের হাতিয়ারগুলি আরও উন্নত হয় এবং নতুন নতুন কলাকৌশল মানুষ আয়ত্ত করে। নব্য প্রস্তর যুগের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫,০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ অব্দ বলে ধরা হয়। নব্য প্রস্তর যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বয়ন ও মৃৎশিল্পের প্রভূত অগ্রগতি ঘটে। পাথরের হাতিয়ার ও অন্যান্য সামগ্রী আগের চেয়ে অনেক উন্নত ও মসৃণ হয়।

ফলে কৃষিক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে। মানুষ এই সময় আগুনের ব্যাপক ব্যবহার শেখে। মৃতদেহ কবর দেওয়ার রীতি প্রচলিত হয়। লিখন-পদ্ধতি এবং চিত্রশিল্পের প্রতিও এই যুগের মানুষ আকৃষ্ট হয়। নব্য প্রস্তর যুগে সার্বিক ক্ষেত্রেই উন্নততর সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। এজন্য বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এই কালপর্বকে নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লব বা Neolithic Revolution বলে অভিহিত করেছেন। ভারতের মাদ্রাজের বেলারি জেলায় এবং অন্যান্য স্থানের অরণ্য ও পর্বতসংকুল অঞ্চলে নব্যপ্রস্তর যুগের কিছু কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়।

• উপসংহার:-

প্রস্তর যুগের অবসানের পর তাম্র-প্রস্তর যুগ বা Chalcolithic Age-এর সূচনা হয়। মোটামুটিভাবে এই যুগের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৩,০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১,৭৫০ অব্দ। এই যুগে মানুষ তামার সঙ্গে টিন মিশিয়ে ব্রোপ্ত ধাতু তৈরি করতে শিখেছিল। তামা বা ব্রোঞ্জের হাতিয়ার তৈরির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য পাথরের ব্যবহারও প্রচলিত ছিল। এই সময় ভারতে মেহেরগড় ও তারপর সিন্ধু সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।

প্রস্তর যুগ STONE AGE

Leave a Reply