নেহেরুর শাসনা দিনে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র

নেহেরুর শাসনা দিনে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র – জওহরলাল নেহেরুর শাসনামলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল, যদিও তিনি মূলত একটি আদর্শবাদী সমাজতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রবাদী চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। তিনি ভারতের প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে প্রচার করেন। 

নেহেরুর শাসনা দিনে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র

READ MORE – ভারতছাড়ো আন্দোলন কি একটি সতর্কিত বিস্ফোরণ

নেহেরুর শাসনা দিনে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ কিভাবে হয়েছিল ?

উত্তরঃ

গণপরিষদ গঠনের পটভূমি: স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল ভারতীয় গণপরিষদ। দেশের সকল মানুষের হয়ে সংবিধান রচনার দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি পরিষদ। একেই বলা হয় গণপরিষদ। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের বহু আগে থেকেই গণপরিষদ গঠন করে নিজস্ব সংবিধান রচনার দাবি জানিয়ে আসছে ব্রিটিশ সরকারের কাছে। এই দাবি প্রথম উত্থাপিত হয় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে। জাতীয় কংগ্রেসের উত্থাপিত স্বরাজ্যের দাবির মধ্যেই গণপরিষদ গঠনের দাবি নিহিত ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দাবি আরও সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারপর থেকে ক্রমাগতই ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীগণ নিজেদের সংবিধান রচনার অধিকা অর্জনের দাবি জানিয়ে যাচ্ছিলেন। এ বিষয়ে কংগ্রেস, স্বরাজ্য দল নানা সময়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। গণপরিষদ গঠনের অনিবার্য প্রয়োজনীয়তার কথা গান্ধিজি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দেই ঘোষণা করেছিলেন। স্বরাজ্য দলের সদস্যগণ সকল শ্রেণির প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত, বহিঃশক্তির প্রভাবমুক্ত একটি গণপরিষদ গঠনের কথা ঘোষণা করেন ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। রামগড় কংগ্রেসেও গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এই অবস্থায় ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ-আলোচনা চালানোর জন্য ভারতে আসেন স্ট্যাফোর্ড ক্রীপস্ (১৯৪২ খ্রিঃ)। ক্রীপস প্রস্তাবের একটি ধারায় বলা হয়, যুদ্ধান্তে সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদ গঠন করা হবে। কিন্তু ক্রীপস প্রস্তাব ব্যর্থ হয়। পরিশেষে ইংল্যান্ডে শ্রমিকদল ক্ষমতাসীন হলে ওই সরকার ভারত ত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ভারতে আসে ক্যাবিনেট মিশন। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সংবিধান রচনার জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করা। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনায় একটি গণপরিষদ গঠনের কথা বলা হয় (১০ই মে, ১৯৪৭ খ্রিঃ)।

গণপরিষদ গঠন:

ক্যাবিনেট মিশন গণপরিষদ গঠনের জন্য একটি নির্দিষ্ট কার্যক্রম স্থির করে। গণপরিষদের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারকে ভিত্তি করা হয়নি। এক্ষেত্রে কয়েকটি মূল নীতি মেনে নেওয়া হয়। প্রথমত, ব্রিটিশ-শাসিত প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলির জনসংখ্যার অনুপাতে বণ্টিত হবে। দ্বিতীয়ত, সদস্যগণ নির্বাচিত হবে সম্প্রদায় ভিত্তিতে। আসনগুলি (অ-মুসলমান ও অ-শিখ), মুসলমান ও শিখদের মধ্যে বণ্টিত হবে। তৃতীয়ত, দেশীয় রাজ্যগুলি ৯৩ জন প্রতিনিধি পাঠাবে। ক্যাবিনেট মিশনের এই প্রস্তাব অনুসারে গণপরিষদের সদস্যসংখ্যা স্থির হয় ৩৮৯ জন। এই ৩৮৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ব্রিটিশ-শাসিত প্রদেশগুলি থেকে আগত সদস্যসংখ্যা হবে ২৯২ জন।

এর মধ্যে ২১০টি থাকবে সাধারণ আসন আর বাকি আসনের ৭৮টি মুসলমানদের জন্য ও ৪টি শিখদের জন্য সংরক্ষিত হবে। এ ছাড়া চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশগুলি থেকে আসবেন ৪ জন সদস্য। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৬টি আসনে (২৯২ + ৪টি চিফ কমিশনার শাসিত আসন) কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ২০৮টি আসন লাভ করে। মুসলিম লিগ লাভ করে ৭৩টি আসন। যে সমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, তাদের মধ্যে ছিলেন ড. বি. আর আম্বেদকর, বল্লভভাই প্যাটেল, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, মৌলনা আবুল কালাম আজাদ, চক্রবর্তী রাজাগোপালচারী প্রমুখ ব্যক্তি।

প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশন:

গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৪৬ সালের ৯ই ডিসেম্বর। অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন ২০৭ জন সদস্য। মুসলিম লিগের সদস্যরা অধিবেশন বয়কট করেন, কারণ তাঁদের দাবি ছিল পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন। সভার স্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হন ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ (১১ই ডিসেম্বর, ১৯৪৬)। প্রথম অধিবেশন চলে ৯ থেকে ২৩শে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই অধিবেশনে ‘সভার কার্যবিবরণী-সম্পর্কিত কমিটি’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠিত হয়।

এরপর জওহরলাল নেহরু ভারতকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাধারণতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে এক প্রস্তাব আনেন ও তা অনুমোদিত হয়। গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২০শে জানুয়ারি। যা চলে ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত। এই অধিবেশনে যেসব কমিটি গঠিত হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কার্যনির্বাহ কমিটি, মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত কমিটি, সংখ্যালঘু-সংক্রান্ত কমিটি, পরামর্শদাতা কমিটি ইত্যাদি। তা ছাড়া এই অধিবেশনে সহ-সভাপতি হিসেবে হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায় নির্বাচিত হন।

তৃতীয় ও চতুর্থ অধিবেশন: গণপরিষদের তৃতীয় অধিবেশন বসে ২২শে এপ্রিল। এই অধিবেশনে বিভিন্ন কমিটিগুলি তাদের প্রতিবেদন পেশ করে এবং প্রতিবেদনগুলির ওপর আলাপ-আলোচনাও চলে। এই অধিবেশনে ‘কেন্দ্রীয় সংবিধান কমিটি’ ও ‘প্রাদেশিক সংবিধান কমিটি’ নামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কমিটি তৈরি হয়। কমিটি দুটির সভাপতি হন যথাক্রমে জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। তৃতীয় অধিবেশন চলে ২রা মে পর্যন্ত। চতুর্থ অধিবেশনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সংবিধান কমিটির প্রতিবেদন পেশ করা হয় এবং ভারতের জাতীয় পতাকার পরিকল্পনা করা হয়। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সংবিধানের মূল নীতিগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হয় এবং অন্যান্য কমিটির রিপোর্ট পেশ করা হয়। অধিবেশন চলে ২২শে এপ্রিল থেকে ২রা মে পর্যন্ত।

সংবিধান রচনা:

ইতিমধ্যে ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। (১৯৪৭ খ্রিঃ, ৩রা জুন)। এতে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকার ‘ভারত’ ও ‘পাকিস্তান’ নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। দুটি দেশের দুটি পৃথক গণপরিষদ নিজ নিজ সংবিধান রচনা করবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ১৯৪৭সালের ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে গণপরিষদের একটি বিশেষ অধিবেশন বসে। ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী গণপরিষদ সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন পরিষদের মর্যাদা লাভ করে ও স্বাধীন ভারতের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ক্ষমতা পায়। একটি খসড়া সংবিধান তৈরির উদ্দেশ্যে ড. আম্বেদকরের সভাপতিত্বে একটি খসড়া কমিটি গঠিত হয়।

এই কমিটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা নভেম্বর থেকে সংবিধান-সম্পর্কিত কাজ শুরু করে। সংবিধানের খসড়া প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে। এই খসড়ায় ছিল ৩১৫টি ধারা ও ১৩টি তপশিল্। খসড়াটি সম্পর্কে জনগণের মতামত জানার জন্য আট মাস অপেক্ষা করা হয়। খসড়াটির উপর মোট ৭৩৬৫টি সংশোধনী প্রস্তাব আসে, যার মধ্যে ২৪৭৩টির সম্পর্কে গণপরিষদে আলোচনা ও বিতর্ক চলে।

শেষ পর্যন্ত ৩৯৫টি ধারা ও ৮টি তপশিল অনুমোদিত হয়। গণপরিষদ ভারতীয় সংবিধান গ্রহণ করে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে নভেম্বর। ১৬৫ দিন ধরে ১১টি অধিবেশন চলার পর, প্রায় তিন বছর সময় নিয়ে প্রণীত হয় ভারতীয় সংবিধান। এর জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৬৪ লক্ষ টাকা। গণপরিষদের সর্বশেষ অধিবেশন আহূত হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে জানুয়ারি। ওই অধিবেশনে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ। অতঃপর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারি তারিখ থেকে স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকরী হয়। ওই দিনটি ‘প্রজাতান্ত্রিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত হয়।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির শক্তিশালীকরণ:

নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেন এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার উপর জোর দেন।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রচার:

তিনি একটি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেন, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে।

নেহেরুর শাসনা দিনে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র

Leave a Reply