নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭) ছিলেন একজন ইতালীয় রেনেসাঁর রাজনৈতিক দার্শনিক এবং রাষ্ট্রনায়ক, যিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য প্রিন্স” (The Prince)-এর জন্য পরিচিত। ফ্লোরেনটাইন প্রজাতন্ত্রের সচিব হিসেবে কাজ করার পর, তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক বাস্তববাদ, ক্ষমতা অর্জন ও রক্ষার কৌশল এবং নৈতিকতার চেয়ে শাসনের স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণা দেন, যা “ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম” নামে পরিচিতি লাভ করে। 

READ MORE – হিটলার ও ন্যাৎসীবাদ (Hitler and Nazism) (1918-1933)

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি

উত্তর:-

ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের বাসিন্দা ম্যাকিয়াভেলিকে “আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক” বলা হয়। তিনি লরেঞ্জো দ্য মেডিচির মৃত্যুর পর ফ্লোরেন্সের প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত হলেও নানা অনৈক্য ও অন্তর্ঘাতের জন্য সরকারেরও পতন ঘটে এবং তিনি নিজেও কারারুদ্ধ হন। ওই সময় থেকে তিনি প্লেটো, পলিবায়াস ও অ্যারিস্টটলের লেখা পড়ার সুবাদে নিজের ভেতরে এক নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলেন।

• রাষ্ট্রচিন্তা বিষয়ক গ্রন্থ:-

এর প্রতিফলন ঘটে ম্যাকিয়াভেলির লেখা ‘The Prince (1513), ‘The Discourses on the First Ten Books of Titus Livius (1513-1516), ‘History of Flosrence’, ‘Art of Way’, ‘Mandogda’ ইত্যাদি গ্রন্থে। তবে তাঁর ‘The Prince’ ও ‘The Discourses’ গ্রন্থে তাঁর রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল সবচেয়ে বেশি।

• মানুষের প্রকৃতি:-

রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম উপাদান হল জনসমষ্টি। কিন্তু ম্যাকিয়াভেলির মতে, এই মানুষের স্বভাব বা প্রকৃতি হল পরস্পরের মধ্যে স্বার্থ-সংঘাত, যা রাষ্ট্রকে অরাজকময় বা নৈরাজ্যময় করে তোলে। তিনি মনে করেন, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হল স্বার্থপরতা, লোভ-লালসা ও আত্মকেন্দ্রিকতা। মানুষ এতটাই সুবিধাবাদী যে কিছু পাওয়ার জন্য ন্যায়নীতিও ত্যাগ করতে পারেন। সমষ্টিগত রাষ্ট্রীয় জীবনের জন্য যা বিপজ্জনক।

• নীতি-ধর্মবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতা:-

ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন, রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনীতি কখনো এক হতে পারে না। তাই চার্চ বা যাজক শ্রেণি রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য স্থাপন করুক তা তিনি চাননি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গকে নিজেদের ব্যক্তিগত ন্যায়-নীতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে যে কেউ তার ধর্ম ও নীতিবোধের দ্বারা চালিত হতেই পারেন।

• সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব:-

ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রের হাতে এক চরম, অবিভাজ্য ও অহস্তান্তরযোগ্য ক্ষমতা প্রদানের পক্ষপাতি। এরূপ নিরঙ্কুশ ও অবাধ ক্ষমতাই হল আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। আর রাষ্ট্রের এরূপ ক্ষমতার নাম হল সার্বভৌম ক্ষমতা। যেহেতু রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্ভব ঘটেছে মানুষের জীবন ও সম্পত্তির সংরক্ষণ ও রক্ষার জন্য, তাই রাষ্ট্রের ক্ষমতা সার্বভৌম ক্ষমতাই হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাঁর ‘দ্য প্রিন্স’ রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ক্ষমতার গুরুত্বকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

• রাষ্ট্রের প্রকৃতি:-

ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের পরিচালন যন্ত্র সরকারের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অ্যারিস্টট। পথ অনুসরণ করে বলেছেন রাষ্ট্র কিংবা সরকার তিন প্রকার হতে পারে। যেমন-রাজতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক ও নিয়মনির্ভর গণতান্ত্রিক। সব ধরনের রাষ্ট্র ও সরকারকে জনকল্যাণের নিরীখে তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।

• রাষ্ট্রীয় দর্শনের তত্ত্ব:-

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্র দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল- (ক) রাষ্ট্রের লক্ষ হবে ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা বৃদ্ধি ও তার প্রয়োগ। (খ) রাষ্ট্র হবে পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ অর্থাৎ চার্চ বা অন্য কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে। (গ) রাষ্ট্রে মানুষই হল গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কিছু না। তাই মানুষের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব বৃদ্ধি পায়। (ঘ) সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ে মানুষের সেবায় ও নিরাপত্তাদানে। (ঙ) ম্যাকিয়াভেলির এই রাজনৈতিক দর্শনকে অধ্যাপক এইচ. জে. ল্যাক্সি ‘ক্ষমতার ব্যাকরণ’ (Grammer of Power) বলে মন্তব্য করেছেন।

• রাজতন্ত্রের ধারণা:-

ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, রাজার প্রধান কাজ রাজ্যকে রক্ষা করা। প্রজারা রাজাকে ভয় করবে, কিন্তু ঘৃণা করবে না। আর রাজা প্রজাদের শাস্তি দেবেন সব দিক বিচার-বিবেচনা করে। ভালোবাসার চেয়ে ভয় দেখিয়ে রাজাকে জনগণের থেকে আনুগত্য আদায় করতে হবে। ম্যাকিয়াভেলির মতে রাজতন্ত্রের স্বার্থে রাজাকে কঠোর, কুটিল, সাহসী, নিষ্ঠুর, দয়ালু, ধূর্ত, বীর, প্রয়োজনে মিথ্যাচারী ও শৌর্যবীর্যবান দৃঢ় মনের মানুষ হতে হবে। রাজধর্ম ঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে রাজাকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টাও করতে হবে। ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে আছে-রাজাকে হতে হবে সিংহের মতো বলশালী, কিন্তু শৃগালের মত ধূর্ত।

• প্রজাতন্ত্রের ধারণা:-

ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ‘দ্য ডিসকোর্সেস’ গ্রন্থে লিখেছেন, প্রজাতান্ত্রিক শাসনে মানুষের স্বার্থে ও স্বাধীনতা বেশি সুরক্ষিত থাকে। তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রে জনগণের কণ্ঠই হল ঈশ্বরের কণ্ঠ। রাজা ‘সমষ্টির মঙ্গাল’-এর জন্য প্রজাতন্ত্রকে গ্রহণ করতেই পারেন। তিনি প্রজাতন্ত্রকে শ্রেষ্ঠতর শাসনব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বলেছেন, একটি এক ধরনের ‘মুক্তরাষ্ট্র’ (Free Stage)। তিনি বলেছেন, মানুষ তো স্বভাবে গরীব ও সৎ, সভ্যতা তাকে অসৎ করেছে-“Man is poor but is corrupted by civilization.” তাই প্রজাস্বার্থে সরকারের কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশও তিনি দিয়েছেন।

• মূল্যায়ন:-

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা ও রাষ্ট্র দর্শন বহু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর ও অস্পষ্ট।

ত্রুটি:-

(১) সুবিরোধী রাষ্ট্রচিন্তা: তিনি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র ও মঙ্গলকামী প্রজাতন্ত্রকে প্রশংসা করে অদ্ভুত এক প্রহেলিকা সৃষ্টি করেছেন বলে পন্ডিত জর্জ স্যাবাইন ও বেনেদিতি ক্রোচে মনে করেন। অনেকে আবার ম্যাকিয়াভেলিকে ‘রাজাদের কুমন্ত্রণাদাতা’ বলেছেন।

(২) বলপ্রয়োগ নীতির সমর্থন: তিনি বলপ্রয়োগ তত্ত্বকে তুলে ধরে অনেক মানবিক গুণকে অস্বীকার করেছেন।

(৩) রাষ্ট্রদর্শন বিভ্রান্তিকর: ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শনে অনেক বহুমুখী তত্ত্ব বিবৃত হয়েছে। তিনি একজন রাজনীতিবিদের বহু গুণ ও দূরদর্শিতার কথা বলেছেন।

(৪) রাষ্ট্রচিন্তার বহুদিক উপেক্ষিত: শক্তিশালী আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য যা দরকার প্রায় সবই তিনি ব্যক্ত করেছেন। তাঁর জাতীয়তাবোধ খণ্ডিত হলেও মানুষ ও তার আচরণকে রাষ্ট্রনীতিতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

(৫) রাষ্ট্র ও সমাজ বিষয়ে অদূরদর্শী ধারণা: তিনি বলেছেন যে, প্রতিটি রাষ্ট্রের গর্ভে সমাজের জন্ম হয়। অর্থাৎ আগে রাষ্ট্র ও পরে সমাজ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ রাষ্ট্রের বহু আগে সমাজ গড়ে উঠেছিল বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থেকে সমাজ বিজ্ঞানী সবাই মনে করেন।

(৬) ভালো-মন্দের ব্যাখ্যাঃ তিনি রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাচীন রোমান রাষ্ট্রনীতিবিদ সিসেরো প্রদত্ত। প্রাকৃতিক আইনের যথার্থতা যাচাই করেননি। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি ভালো, আর স্বার্থের পরিপন্থী বিষয়গুলি ‘মন্দ’। একথা সর্বদা প্রয়োজ্য নাও হতে পারে।

• সাফল্য:-

কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও একথা সম্পূর্ণভাবে সত্য যে, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তাধারাকে আজও শ্রদ্ধার সলো স্মরণ করতে হয়। কারণ-

(১) তৎকালীন অরাজকময় অবস্থার উপলব্ধি: রাজনৈতিক ঐক্য ও শৃঙ্খলার অভাবে যে অস্থিরতা সমগ্র ইটালি জুড়ে চলছিল; তাতে করে শক্তিশালী জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করা ছাড়া উপায় ছিল না।

(২) পরীক্ষিত নয় অভিজ্ঞতাই রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি: একজন বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতিবিদ্রূপে তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছেন তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের স্বরূপ চিন্তা করেছেন মাত্র। কোনও কিছুই পরীক্ষিত নয়, তাই চূড়ান্তও নয়।

(৩) সার্বভৌম ক্ষমতার গুরুত্ব: আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে সার্বভৌম ক্ষমতা, তা ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম বলেছিলেন। অবশ্য তিনি অবাধ, চরম ও অহস্তান্তরযোগ্য এই সার্বভৌমিকতার সঠিক ও সম্পূর্ণ ব্যখ্যা দেননি।

(৪) বুর্জোয়াদের গুরুত্ব: তিনি মধ্যবিত্তি বুর্জোয়া শ্রেণির অবদান আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য খুবই গুরুত্ব বলে উপলব্ধি করেছিলেন। ইশিয়া বার্লিন (Ishiah Barlin) মন্তব্য করেছেন, ম্যাকিয়াভেলি ব্যক্তির নৈতিকতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতার তফাৎ শুধু ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা ভালো হয়েও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভালো নাও হতে পারে। জর্জ এইচ স্যাবাইন লিখেছেন, ‘তাঁর দর্শনের সঠিক অর্থটাই হল আধুনিক ইতিহাসের প্রধানতম বিষয়’ (The true meaning of his philosophy have been one of the enigmas of modern history)

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি

Leave a Reply