দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা হল এমন একটি আইনসভা যা দুটি পৃথক কক্ষ নিয়ে গঠিত: একটি উচ্চকক্ষ এবং একটি নিম্নকক্ষ। এই ধরনের ব্যবস্থায়, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দুটি কক্ষের মধ্য দিয়ে যায়, যা ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং আইন পাসে ভুল বা ক্ষতিকর বিষয় প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো অনেক দেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রচলিত আছে। 

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা এমন এক ধরনের শাসনব্যবস্থা, যেখানে আইন প্রণয়নের কাজ দুটি পৃথক সভার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এই দুটি সভাকে সাধারণত উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ বলা হয়। ভারতের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ হলো লোকসভা এবং উচ্চকক্ষ হলো রাজ্যসভা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হলো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তাভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে তাড়াহুড়ো করে বা পক্ষপাতমূলক কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত না হয়।

Table of Contents

READ MORE – স্বাধীনতার অধিকার

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা কাকে বলে? দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তিগুলি উল্লেখ করো।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা:- 

যে সকল আইনসভার দুটি কক্ষ আছে তাকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা বলে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভায় থাকে একটি উচ্চকক্ষ এবং একটি নিম্নকক্ষ। উচ্চকক্ষকে দ্বিতীয় কক্ষ এবং নিম্নকক্ষকে প্রথম কক্ষ বলা হয়। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভার প্রকৃত উদাহরণ।

এই ব্যবস্থায় নিম্নকক্ষ সাধারণত জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হয় এবং জনমতের প্রতিফলন ঘটায়। অপরদিকে উচ্চকক্ষ মূলত অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বা রাজ্যের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়, যারা দেশের আইন ও নীতিনির্ধারণে পরামর্শমূলক ও পর্যালোচনামূলক ভূমিকা পালন করে। এইভাবে উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করে এবং প্রয়োজনে সংশোধনের প্রস্তাব দিতে পারে। ফলে কোনো আইন প্রণয়নের আগে তা দুটি স্তরে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়, যা সিদ্ধান্তকে আরও পরিপক্ব ও কার্যকর করে তোলে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে। এটি একদিকে জনগণের ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে, আবার অন্যদিকে নীতিগত স্থিরতা ও সংযম বজায় রাখে। ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশে এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে কার্যকর, কারণ এটি কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে কখনও কখনও দুটি কক্ষের মধ্যে মতবিরোধের কারণে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। তবুও দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা গণতন্ত্রে এক ধরনের পরিমিতি ও যুক্তিবাদিতা নিশ্চিত করে, যা দেশের নীতি ও শাসনব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও কার্যকর করে তোলে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে যুক্তি: –

অধিকাংশ রাষ্ট্রেই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা বর্তমান। জন স্টুয়ার্ট মিল, ব্লুন্টন্সি, লেকি, লর্ড অ্যাকটন, হেনরি মেইন, জেফারসন, দ্যুগুই প্রমুখ দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভাকে সমর্থন করেছেন। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে যুক্তিগুলি হলো:

◇ (১) স্বৈরাচারিতা রোধ করে:-

আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হলে নিম্ন কক্ষ উচ্চকক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং নিম্নকক্ষকে সঠিক পথে চলার জন্য বিশেষ উপযোগী ব্যবস্থা নেয়। অর্থাৎ বলা যায় আইনসভার উচ্চকক্ষটি নিম্নকক্ষের স্বৈরাচারিতাকে রোধ করে।

◇ (২) সংখ্যালঘুর স্বার্থসংরক্ষণ:

আইনসভায় গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সংখ্যালঘুর স্বার্থ সংরক্ষণ অর্থাৎ সংখ্যালঘুর উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা। আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হলে উচ্চকক্ষে পরোক্ষ নির্বাচনে বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক তাঁরা স্থান পেতে পারেন।

◇ (৩) সুচিন্তিত আইনপাশ:-

আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হলে প্রণীত আইনটি যথাযথভাবে বিচার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারে। কারণ নিম্নকক্ষে আইনটি যদি কোনোরূপ আবেগের বশবর্তী হয়ে অগ্রসর হয় তাহলে উচ্চকক্ষ তাকে বাধা দিতে পারে। এরফলে নিম্ন কক্ষ ওই আইনটি পুনরায় বিচার বিশ্লেষণ করে দেখার সুযোগ পায়।

◇ (৪) আইনসভার মান বৃদ্ধি পায়:-

অনেক সময় রাজনৈতিক দিক থেকে জ্ঞানী ও বিজ্ঞ ব্যক্তি প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জটিলতায় প্রবেশ করতে চান না। এরফলে দেশ তাঁদের সেবা পায় না। কিন্তু দ্বিতীয় কক্ষের অস্তিত্ব থাকলে পরোক্ষ নির্বাচনের মধ্যে তাঁরা আসতে পারেন এবং দ্বিতীয় কক্ষটি হয়ে উঠতে পারে জ্ঞানী ব্যক্তিদের কক্ষ। এরফলে আইনসভার মান বৃদ্ধি পায়।

◇ (৫) কাজের চাপ হ্রাস পায়: –

আইনসভাটি এককক্ষ বিশিষ্ট হলে কাজের চাপ বাড়ে। কিন্তু দ্বিতীয় কক্ষ থাকলে নিম্নকক্ষের ওপর কাজের চাপ অনেকটা লাঘব হয়। আইন প্রণয়নমূলক কাজ, অনুসন্ধানমূলক কাজ প্রভৃতি যথারীতিভাবে চলার সুযোগ পায়।

◇ (৬) যথাযথ জনমতের প্রতিফলন:-

আইনসভা দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট হলে নির্বাচনের সময়ও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। একটি কক্ষের নির্বাচনের পর জনমনের পরিবর্তনও ঘটতে পারে। ফলে নির্বাচিত কক্ষটি তার কাজে সংযতভাবে অগ্রসর হতে পারে। এরফলে শাসনব্যবস্থা আরো সুগঠিত হয়।

◇ (৭) রাজনৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন:-

এককক্ষ বিশিষ্ট আইন সভায় প্রায় সম মনোভাব সম্পন্ন প্রতিনিধি থাকেন বলে বিতর্কিত বিষয়গুলি বিশেষ যুক্তি সম্পন্ন হয় না, এর ফলে জনমনে বিশেষ প্রভাব পড়ে না। কিন্তু দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার যেসব আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় তা বিভিন্ন গণমাধ্যমের দ্বারা জনমনকে প্রভাবিত করতে পারে, এরফলে জনমনে রাজনৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটে।

পরিশেষে বলা যায় যে, আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হলে এককক্ষ অপরকক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এরফলে কোনো কক্ষই নিজ দলীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যস্ত না হলে উভয়ই জনকল্যাণ রক্ষার্থে সচেষ্ট হয়। ফলে শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার বিপক্ষে যুক্তি :-

যেসব আইনসভা দুটিকক্ষ নিয়ে গঠিত তাকে দুটি কক্ষবিশিষ্ট বা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা বলে। যাঁরা দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার বিপক্ষে যুক্তির অবতারণা করেছেন, তাঁরা হলেন-হ্যারল্ড ল্যাস্কি, ব্যোম, আবেসিয়ে, ফ্রাঙ্কলিন প্রমুখ। তাঁদের যুক্তিগুলি হলো:

(১) দীর্ঘসূত্রতা:

আইনসভার দুটি কক্ষ থাকলে আইন প্রণয়নে বিলম্ব ঘটে। কারণ এক কক্ষে আইন পাশ হবার পর অপর কক্ষের সম্মতির জন্য বসে থাকতে হয়। অপর কক্ষটি যদি অনাবশ্যকভাবে বিলম্ব করে তবে স্বাভাবিকভাবে আইনটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

◇ (২) অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা:

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কক্ষটি স্বার্থসমন্বিত শ্রেণির দ্বারা গঠিত হয় এবং দ্বিতীয় কক্ষ ওই শ্রেণিরই স্বার্থরক্ষা করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে এর কোনো সামঞ্জস্য থাকে না বলে একে অগণতান্ত্রিক, ব্যবস্থা বলা হয়।

◇ (৩) অনাবশ্যক ব্যবস্থা:

বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা দলব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়েছে। দলীয় ব্যক্তিরাই নির্বাচিত হন, তাঁরাই ভাবীকালের জন্য আইন প্রণয়ন করেন এবং তা সবই দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে হয়। এই আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন সহমত, কাজেই দ্বিতীয় কক্ষ সৃষ্টি করে সময় নষ্ট করা অনাবশ্যক।

◇ (৪) ব্যয়বহুল:

বিরুদ্ধবাদীরা মনে করেন আইনসভার দুটি কক্ষ থাকলে ব্যয় দ্বিগুণ হয়। এই ব্যয় এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এই কারণে ল্যাস্কি মন্তব্য করেছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সকল কাজের জন্য এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভাই যথেষ্ট।

◇ (৫) আইনপাশের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যতা:

কেউ কেউ যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন যে, আইনসভাএককক্ষ বিশিষ্ট হলে হঠাৎই আইন পাশ হয়ে যেতে পারে-এই ব্যবস্থা রোধ করার জন্য দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা দরকার। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীগণ মনে করেন বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হঠাৎই কোনো আইন পাশ হয় না, তার জন্য বিশেষ বিচার-বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া আইন পাশের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিও আছে। এক্ষেত্রে হঠাৎই কোনো আইন পাশ হয় না।

◇ (৬) দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায়:

আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হলে দায়িত্বও ভাগ হয়ে যায়। পূর্ণ দায়িত্ব থাকে না বলে আইন প্রণয়নে অনীহা দেখা দিতে পারে, এরফলে আইনটি তার কার্যকারিতা হারাবে।

◇ (৭) যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়:

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা অপরিহার্য নয়। মনে করা হয় যে আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার জন্য দ্বিতীয় কক্ষটির কার্যকারিতা আছে, কিন্তু দেখা যায় যে, আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কতকগুলি আইন সৃষ্টি করা হয় এবং প্রয়োগ কর্তাও থাকে। কাজেই দ্বিতীয় কক্ষের প্রয়োজন নেই।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা

Leave a Reply