দিল্লির সুলতানী রাষ্ট্রের প্রকৃতি

দিল্লির সুলতানী রাষ্ট্রের প্রকৃতি -তে সামন্ততান্ত্রিক, সামরিক এবং ধর্মীয় উপাদানের মিশ্রণ দেখা যায়, যা এটিকে একটি জটিল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। সুলতানরা সামরিক সেবা ও শাসনের বিনিময়ে অভিজাতদের জমি দিতেন এবং এই অভিজাতরা মনসবদার নামে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রটি মূলত ইসলামী আইনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হলেও অনেক ঐতিহাসিক এর ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যকেও গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে সুলতানরা নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য অভিজাত ও ধর্মীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। 

Table of Contents

READ MORE – ঔরঙ্গজেবের আমলে মারাঠাদের সঙ্গে মুঘল চুক্তি সংঘাত

দিল্লির সুলতানী রাষ্ট্রের প্রকৃতি

• ভূমিকা:-

প্রায় দীর্ঘ ৩২০ বছরের সুলতানি শাসনে দিল্লিকে কেন্দ্র করে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যা প্রাচীন পারস্যের সাসানীয় বংশের রাজাদের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুলতান ছিলেন প্রজাদের প্রভু, মালিক, তাদের ধন প্রাণ স্বাধীনতার রক্ষক, আইন ও ন্যায় ধর্মের প্রতিষ্ঠানা ও রাষ্ট্রে তিনিই ঈশ্বর। সুলতানের কৃপাদৃষ্টিতে সুখ ও রক্তচক্ষুতে হৃৎকম্পন। সুলতানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় হারেম, সংগঠন, নানা প্রশাসনিক দপ্তর, ক্রীতদাস, দাসী, খোজা প্রহরী, অনুচর, পরিচারক, জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক, উৎসব অনুষ্ঠান, রাজকীয় প্রতীক, সামরিক বিভাগ, অস্ত্রসজ্জা, রণকৌশল ইত্যাদি সবই পারসিকদের থেকে নেওয়া।

সুলতানদের ব্যক্তিগত জীবনে পারসিকদের পোলো, দাবা খেলা, মৃগয়া, সুরা, গানবাজনা, নওরোজ ও বসন্তোৎসব, ভগবত সংস্কৃতি চর্চা, অগ্নি উপাসক পুরোহিতদের ভবিষদ্‌বাণী নানা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষে এক নতুন রাজতান্ত্রিক নীতি অনুসৃত হয়েছিল। এর সঙ্গে কোরানে বর্ণিত শরিয়তি শাসন ব্যবস্থার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে দিল্লির সুলতানদের অধীন রাষ্ট্রের প্রকৃতি বিচার করতে হলে আগে ইসলামি রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যগুলি জেনে রাখা প্রয়োজন। কারণ পয়গম্বর হজরত মহম্মদ থেকে বিভিন্ন খলিফাদের সময় পর্যন্ত নানা ভাবাদর্শে ইসলামীয় রাষ্ট্রের ধারণা গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এখানে ধর্মকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের চিন্তা করা হয়নি।

• উলেমা প্রভাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থা:-

আপাতভাবে সুলতানি আমলে উলেমাদের প্রভাবের কথা বলা হলেও বাস্তবে উলেমাতন্ত্র কোনো বাশানুক্রমিক ক্ষমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র লাভ করতে পারেনি। উলেমারা হলেন শরিয়তি আইনের ব্যাখ্যাকার। কিন্তু আলাউদ্দিন গলজি কোনোভাবেই উলেমাদের প্রশ্রয় দেননি, বা তাদের পরামর্শ মেনে শাসন করেননি। আর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উলেমাদের সাংগঠনিক শস্ত্রি তেমন ছিল না। তাই মহম্মদ হাবিব তাঁর “পলিটিক্যাল থিয়োরি অফ দ্য দিল্লি সুলতানেট” প্রশ্নে বলেছেন, “মধ্যযুগের ভারতীয় রাষ্ট্র কোনোভাবেই ধর্মাশ্রিত পুরোহিততন্ত্র নয়।” ড. আই. এইচ. কুরেশি তাঁর ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আন্ডার দ্য সুলতানেট’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, “দিল্লির সুলতানি কোনোভাবেই ধর্মাশ্রিত হতে পারে না।” এই ময় সমর্থন করেছেন ড. সতীশ চন্দ্র, ড. ইফতিকার আলম খাঁন, ড. কে. এম. আশরাফ প্রমুখ।

• সমন্বয়ধর্মিতা:

দিল্লির সুলতানদের প্রবর্তিত শাসন সমন্বয়ধর্মী। এই শাসন ব্যবস্থায় আরবদেশের খলিফাতন্ত্র, পারস্যের রাজতন্ত্র ও ভারতের গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন তন্ত্রের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। সুলতানগণ খলিফার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেও তা নিতান্ত ধর্মীয় বিশ্বাস মাত্র। আর সুলতানি সিংহাসনের মর্যাদা বাড়াবার জন্যই কেবল খলিফার ফরমানকে মাঝে মধ্যে ব্যবহার করা হত। তাই কট্টরপন্থী শরিয়তি আইন সুলতানি কোনো যুগেই প্রয়োগ করা হয়নি। বারণী লিখেছেন, কোনো সুলতানের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে শরিয়তি বিধান প্রয়োগ করা হত না। সুলতান শুধুমাত্র রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ‘আইনকানুন’ বা ‘তাওয়াবিত’ রচনা করতেন।

• শরিয়তি আইনের নিষ্ক্রিয়তা:-

দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্র বহু বিষয়ে শরিয়তি আইনের বাইরে থেকে গিয়েছিল। যেমন- (১) ধর্মশাস্ত্র অনুমোদিত নয় এমন পৌত্তলিক অমুসলমানদের ওপর রাষ্ট্র কোনো বৈষম্যমূলক ব্যবহার করেনি। (২) অমুসলমানদের মধ্যে সম্পত্তিঘটিত বিবাদ মীমাংসার জন্য হিন্দু পণ্ডিতরা হিন্দু আইন প্রয়োগ করতে পারতেন। (৩) গ্রাম সভ্যতাগুলির দৈনন্দিন কোনো কাজে সুলতান বাধা হয়ে দাঁড়াতেন না, (৪) আলাউদ্দিন ও মহম্মাদ বিন তুঘলক রাষ্ট্র শাসনে উলেমাদের পরামর্শ নেননি। (৫) দিল্লির সুলতানদের প্রভাব প্রতিপত্তি উলেমা, মিল্লাত অথবা খলিফার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি।

• সুলতানদের আদর্শগত বৈচিত্র্য:-

সুলতানি শাসন ইসলামি রাষ্ট্র নয়। কারণ- (ক) খাঁটি ইসলামের আদর্শ রাজতন্ত্রে গৃহীত হয়নি। (খ) সুলতানগণ বলপ্রয়োগ ও সুযোগপন্থা (force and expediency)-কে তাঁদের নীতি ও কর্মপন্থা বলে অনেক সময় গ্রহণ করেছেন। (গ) শরিয়তকে তাঁরা পাঁচটি আইনের মতোই মনে করে গ্রহণ করতেন, (ঘ) শরিয়তে সুদ দেওয়া-নেওয়াকে ধর্মবিরোধী মনে করলেও ব্যবসাবাণিজ্যে সুদের লেনদেন চালাত প্রতিটি সুলতান। (ঙ) উলেমারা বিষয় ও ক্ষমতার লোভের উর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতালোভী উলেমারা ক্ষমতা লাভের জন্য কোরানের ভুল ব্যাখ্যা অনেক সময় করতেন।

• রাষ্ট্রের শাসন যন্ত্র:-

সুলতান যতই স্বৈরাচারী হোক না কেন, তিনি একা হাতে কোনো কাজই করতেন না। তিনি যোগ্য মন্ত্রী বা ‘ওয়াজির’ ও অফিসারদের নিয়ে শাসন কাঠামো গড়ে তুলতেন। সুলতানের অধীন রাষ্ট্রের মুখ্য বিভাগগুলি হল-

(১) দেওয়ান-ই-রিসালং’ (আপিল বিভাগ), (২) দেওয়ান-ই আরজ’ (সামরিক বিভাগ), (৩) ‘দেওয়ান-ই-বান্দাগান’ (দাসদাসী বিভাগ), (৪) ‘দেওয়ান-ই-ইনসা’ (রেকর্ড বিভাগ), (৫) ‘দেওয়ান-ই-খয়রাৎ’ (দাতব্য বিভাগ), (৬) ‘দেওয়ান-ই-ডিহারাত’ (অর্থ বিভাগ), (৭) ‘দেওয়ান-ই-আমির কেছি’ (কৃষি বিভাগ) ইত্যাদি।

এই বিভাগগুলি মন্ত্রীদের দায়িত্বে ছিল। এছাড়া আরও বহুবিভাগ ছিল। আরও কিছু দপ্তর ছিল যার দায়িত্ব সামলাত পদস্য অফিসারগণ। তবে ওয়াজির বা মুখ্যমন্ত্রী অনেক বিভাগের দায়িত্ব সামলে দিত। মালিক কাফুর ও খান জাহান মকবুল ছিলেন এমন মুখ্যমন্ত্রী যাঁদের ভূমিকা দিল্লির সুলতানি উতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এ আড়া বিচার বিভাগে ‘কাজী’, আইন বিভাগে ‘কোতোয়াল’ (Kotwal) ও জনগণের আচার-আচরণ লক্ষ রাখতে ‘মুহতাসিব’ (Muhtasib) নামে রাজকর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন।

• প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা:-

সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে সুলতানি সাম্রাজ্যের পরিধি বিশাল হয়েছিল। এই সময় বিশাল সাম্রাজ্য ২৩টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি প্রদেশের দায়িত্বভার একজন করে গভর্নরের হাতে ছিল। এঁরা রাজ পরিবারের সদস্য হিসাবে কাজ করতেন। নিজ নিজ প্রদেশে গভর্নরগণ চরম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তবে তারা শাসন, বিচার সামরিক ইত্যাদি বিষয়ে বহু অভিজাতকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন। প্রাদেশিক সুলতান কেন্দ্রের মতো সমস্ত বিভাগ নিজের মতো তৈরি করতেন। তবে অভিজাতদের সহযোগিতা বহু ক্ষেত্রে নানা সমস্যা সৃষ্টি করত বলে ড. কালি কিঙ্কর দত্ত মনে করেন।’ চৌধুরী, প্যাটেল, পাটোয়ারি ও পঞ্চায়েত-এর মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালিত হত। তবে ড. কে. এম. আশরাফের মতে, পুরো শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি সুলতান ধরে রেখেছিলেন।

• মূল্যায়ন:-

পরিশেষে বলতে হয় দিল্লির সুলতানদের অধীনে রাস্টের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল সুলতানই সর্বশক্তিমান। কারণ ‘মুজলিস-ই-খলওয়াত’ ও অভিজাতদের ‘বার-ই-খাস’ সভার সিন্ধান্ত সুলতান নাও নিতে পারতেন। তিনি উলেমাদের প্রশ্রয় দিতেন না, আবার পীড়নও করতেন না। সুলতানের ক্ষমতা একেবারে “ধর্মীয় ও সামরিক” (Religious and military)।

তাই সুলতান সুমি ধর্মশাস্ত্র ‘হানাফি ও শরিয়তের বিধান মেনে পাঁচ প্রকার কর আদায় করতেন। যেমন-উস বা মুসলিম প্রদেয় ভূমিকার (১), ‘খিরজ’ বা অমুসলমানদের প্রদেয় ভূমিকর (১/১০-১/২), ‘জিজিয়া কর’ বা অমুসলমাদের প্রদেয় কর (ধনীদের মাথাপিছু ৪৮, মধ্যবিত্তদের ২৪ ও দরিদ্রদের মাথাপিছু ১২ দিরহাম), ‘জাকাৎ’ ব্য মুসলিমদের প্রদেয় কর্মকার (২১/%) ‘খামস’ বা লুণ্ঠিত দ্রব্যের ১/৫ ভাগ আদায় করা হত। ইস্তা ছিল সুলতানি রাজস্বের আর এক উৎস। সব মিলিয়ে সুলতানি রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল ‘স্বৈরতান্ত্রিক’। মিল্লাত প্রথার মাধ্যমে সুন্নি মুসলিম অভিজাতরা সুলতানদের নির্বাচন করলেও তাঁদের স্বেচ্ছাচারিতা আটকাবার উপায় ছিল না।

♦ দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্র কি ধর্মাশ্রয়ী:-

সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ধর্মীয় দিক থেকে সুলতানি রাষ্ট্র ধর্মাশ্রয়ী ছিল, না কি ধর্মনিরপেক্ষ ছিল সেই বিচারে সুলতানি রাষ্ট্র সামরিক না অভিজাততান্ত্রিক ছিল তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।

ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র:-

যে- সমস্ত ঐতিহাসিক সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতিকে ধর্মাশ্রয়ী (Theocratic) বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন-ড. আর পি. ত্রিপাঠী, ড. ঈশ্বরী- প্রসাদ, ড. আশীর্বাদ লাল শ্রীবাস্তব, ড. রামশরণ শর্মা, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। ড. ঈশ্বরী প্রসাদ মনে করেন মধ্যযুগের ভারতে রাষ্ট্র ছিল ধর্মাশ্রয়ী, রাজা ছিলেন একাধারে সিজার এবং পোপ।

(১) ধর্মাশ্রয়ী রাজ্যদর্শ:-

দিল্লির সুলতানরা নিজেদেরকে ঈশ্বরের দূত বা ছায়া হিসেবে মনে করতেন। তারা ছিলেন একাধারে রাষ্ট্র ও ধর্মনেতা। ইসলামের বিধি মেনেই দিল্লির সুলতানগণ শাসনকাজ চালাতেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল “দার-উল-হার্ব” (অমুসলমানের দেশ)-কে “দার-উল-ইসলাম” (মুসলমানের দেশ)-এ পরিণত করা।

(২) খলিফার অনুমোদন:-

খলিফা ছিলেন সমস্ত মুসলিম দুনিয়ার প্রধান ধর্মগুরু এবং শাসক। খলিফার অনুমোদন ছাড়া কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বা মুসলিম শাসকের শাসন বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পেত না। তাই প্রথমদিকের কয়েকজন সুলতান তাদের মুদ্রায় খলিফার নাম উৎকীর্ণ করান এবং খলিফার নামে খুৎবা পাঠ করান।

(৩) উলেমাদের ওপর নির্ভরশীলতা:-

সুলতানি আমলে উলেমারা ছিলেন কোরান ও শরিয়তের ব্যাখ্যাকার। তাঁরা প্রয়োজনে সুলতানকে ধর্মীয় ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন। সুলতানি শাসনের প্রথমার্ধে উলেমাদের যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় ছিল। একমাত্র আলাউদ্দিন খলজি ছাড়া কোনো সুলতান শরিয়ত অগ্রাহ্য করে আইনবিধি রচনা করা বা রাষ্ট্র পরিচালনার সাহস দেখাতে পারেননি।

(৪) অমুসলমানদের অধিকারহীনতা:-

সুলতানি রাষ্ট্রে অমুসলমান শ্রেণির তেমন কোনো অধিকার ছিল না। জিজিয়া কর প্রদানের বিনিময়ে সুলতানি রাষ্ট্রে বসবাস করা ছাড়া তারা আর কোনো বিশেষ সুযোগসুবিধা ভোগের

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র:-

যেসকল ঐতিহাসিক সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি ধর্মনিরপেক্ষ বলে মনে করেন সেই সকল প্রবস্থা হলেন-ড. কুনওয়ার মহম্মদ আশরফ, ইশতিয়াক ম হোসেন কুরেশি, ড. হাবিবউল্লাহ, ড. মুজিব, ড. মহম্মদ হাবিব, ড. ইফতিকার আলম খান, ডা. নিজামি, ড. সতীশ চন্দ্র প্রমুখ। সমকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনিও মনে করতেন সলতানি রাষ্ট্র ছিল জাহান্দারি বা ধর্মনিরপেক্ষ।

(১) ধর্মনিরপেক্ষ রাজাদর্শ:-

ড. হাবিবউল্লাহ মনে করেন সুলতানি রাষ্ট্র প্রকৃতিগত বিচারে কোনো মতেই ধর্মাশ্রয়ী ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতাই ছিল এর মূলভিত্তি। তাঁর মতে দিল্লির সুলতানগণ রাষ্ট্রকে ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেননি। সুলতানগণ অমুসলমানদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্যেও কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করেননি। গিয়াসুদ্দিন বলবন বলেছিলেন, ‘আমি ব্যাক্তিগতভাবে ন্যায়বিচার করতে পারলেই খুশি থাকব।’

(২) শরিয়ত থেকে স্থলন:-

দিল্লির সুলতানগণ শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বদা শরিয়ত নির্দেশিত বিধি মেনে চলেননি। ইসলামের বিধান অনুযায়ী মুসলিমদের প্রাণদও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ফিরোজ তুঘলক ছাড়া অন্য কোনো সুলতানের আমলে তা মানা হয়নি। শরিয়ত বিধি অনুসারে ইসলামীয় রাষ্ট্রে পৌত্তলিকদের কোনো জায়গা নেই। কিন্তু সুলতানি শাসনে ভারতে হিন্দু পৌত্তলিকদের অস্তিত্ব ছিল। শুধু তাই নয় গ্রামীণ প্রশাসন, রাজস্ব বিভাগে এবং শাসন বিভাগের নানা পদে হিন্দুরাও নিয়োজিত ছিলেন।

(৩) খলিফার কর্তৃত্ব অস্বীকার:-

দিল্লির সুলতানগণ খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের প্রচার করলেও আসলে কিন্তু তারা খলিফার নির্দেশ মেনে শাসন পরিচালনা করতেন না। চেঙ্গিজ খাঁর পৌত্র হলাগু-র হাতে আবাসীয় খলিফা আল-মুস্তাসিন বিল্লাহ নিহত হলে দিল্লির সুলতানদের কাছে খলিফার অনুমোদন লাভ ঐচ্ছিক হয়ে পড়ে।

(৪) উলেমাদের ক্ষমতা হ্রাস:-

সুলতানি রাষ্ট্রে মুসলিম ধর্মবিশারদ উলেমারা রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ব্যাপারে সুলতানদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু সুলতানরা উলেমাদের কথামতো দেশশাসন বা ধর্মনীতি প্রণয়ন করতেন না। একদল উলেমা হিন্দুদের ধর্মান্তরণের জন্য চাপ দিলে সুলতান ইলতুৎমিস তা প্রত্যাখ্যান করেন।

♦ রাষ্ট্রের গঠনগত প্রকৃতি:-

(১) সামরিক:-

সুলতানি রাষ্ট্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল। শুধু তাই নয়, এর স্থায়িত্বও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক শ্রেণির ঐতিহাসিক, গবেষকরা মনে করেন সুলতানি রাষ্ট্র ছিল প্রকৃত অর্থে একটি পুলিশ রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ছিল-দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাজস্ব আদায় করা। সুলতান আলাউদ্দিন তাঁর মূলা নিয়ন্ত্রণ নীতি কার্যকর করেছিলেন সামরিক স্বার্থ লক্ষ করেই।

(২) অভিজাততান্ত্রিক:-

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে সুলতানি শাসন ছিল একটি কেন্দ্রীভূত রাজতন্ত্র। এই রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অভিজাতদের বিশেষ স্থান ছিল। সুলতান ইলতুৎমিস “বন্দেগান ই চাহেলগানি” নামক অভিজাত তুর্কিগোষ্ঠীর হাতে প্রস্তুত ক্ষমতা দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অতুর্কিরাও অভিজাততন্ত্রে স্থান পেয়েছিল। অভিজাতদের তিনটি স্তর ছিল। যথা-খান, মালিক, আমির।

• মূল্যায়ন:-

সার্বিক বিচারে সুলতানি রাষ্ট্রকে ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র বলা চলে না। কেন-না সমন্বয়বাদী সুলতানি শাসনব্যবস্থায় একদিকে যেমন খলিফাতন্ত্র উপেক্ষিত হয়েছিল অপরদিকে উলেমাদের প্রভাব নগণ্য হয়ে পড়েছিল। ড় সতীশ চন্দ্র বলেছেন, “প্রকৃতপক্ষে সুলতানি রাষ্ট্র ছিল সামরিক ও অভিজাততান্ত্রিক।”

দিল্লির সুলতানী রাষ্ট্রের প্রকৃতি

Leave a Reply