জাতিসংঘ (United Nations) (1920) হলো কটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা. জাতিসংঘে বর্তমানে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে.।
Table of Contents
READ MORE – ইউরোপের ইতিহাসের কয়েকটি সন্ধি (SOME TREATIES IN EUROPEAN HISTORY) (1802-1939)
জাতিসংঘ (United Nations) (1920)

• লিগের প্রথম সভা ও কার্যালয় (League First Session):-
লিগের কাউন্সিলের প্রথম বৈঠক ১৯২০-এর ১০ জানুয়ারি প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২০-এর নভেম্বরে লিগের প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে স্থানান্তরিত হয়।
• লিগের সরকারি ভাষা (Communication Language):-
১৯২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে সরকারি ভাষা হয় ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ফ্রেঞ্চ। লিগের মূল চারটি সংস্থা হল (১) সাধারণ সভা, (২) নিরাপত্তা পরিষদ, (৩) আন্তর্জাতিক বিচারালয় ও (৪) সচিবালয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থাও লিগের একটি উপশাখা ছিল।
• লিগের সচিবালয় (League Secretariate):-
জেনেভাতে এর স্থায়ী সচিবালয় ছিল এবং এই সচিবালয়ের একজন স্থায়ী সচিব ছিলেন। লিগের প্রথম সচিব হলেন স্যার জেমস এরিক ডুমন্ট।
• সাধারণ সভা (League’s General Assembly):-
সাধারণ সভাতে লিগের সমস্ত সদস্য রাষ্ট্র থেকে তিনজন করে প্রতিনিধিত্ব করত কিন্তু তাদের প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই একটি মাত্র ভোট দিতে পারত। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে লিগের অধিবেশন জেনিভাতে আহ্বান করা হত। এই সমস্ত অধিবেশন লিগে নতুন সদস্য দেশের অন্তর্ভুক্তি, লিগ কাউন্সিলের অস্থায়ী সদস্যের জন্য নির্বাচন, ও আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের বিচারপতিদের নির্বাচিত করত। এখানের লিগের বার্ষিক বাজেট পেশ হত।

• লিগ কাউন্সিল:-
লিগ কাউন্সিল অনেকটা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের মতো কাজ করত। লিগ কাউন্সিল যখন স্থাপিত হয় তখন লিগের মাত্র চারজন স্থায়ী ও চারজন অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র ছিল। লিগের প্রথম স্থায়ী চারজন সদস্য রাষ্ট্ররা হল গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপান। আর যে-প্রথম চারটি অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র ছিল তারা হল ও গ্রিস। অস্থায়ী সদস্যরা তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হতেন। এই স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে আটজন সদস্য রাষ্ট্রের ছটি রাষ্ট্রই ছিল ইউরোপের, তাই লিগকে একটি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান বলা যেতেই পারে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে লিগের অস্থায়ী সদস্য বেলজিয়াম, স্পেন, ব্রাজিল সংখ্যা ৪ থেকে বেড়ে ৬ হয় এবং ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এই সংখ্যা ৬ থেকে বেড়ে ৯ হয়।
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে লোকার্ন চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিকে লিগ কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য করে নেওয়া হয়। এরপর সোভিয়েত রাশিয়াকেও লিগের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র করে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, অস্থায়ী সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়ে ৯ থেকে ১১-তে দাঁড়ায়। তবে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের উদ্যোগে লিগের উদ্ভব হলেও আমেরিকার অনুপস্থিতি লিগকে প্রথম থেকেই দুর্বল করে রেখেছিল। আবার বিংশ শতকের চারের দশকে জার্মানি ও জাপান লিগ ত্যাগ করলে লিগ আরো দুর্বল হয়।
সাধারণভাবে বছরে পাঁচবার লিগের অধিবেশন বসত। প্রয়োজনে লিগের অধিবেশন বৃদ্ধি করা যেত। লিগের সর্বমোট ১০৭টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই ১০৭টি অধিবেশন ১৯২০-১৯৩৯-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
• লিগের অন্যান্য সংস্থা (Others Organs of League):-
লিগের অন্যান্য সংস্থার মধ্যে উল্লেখ্য হল (১) আন্তর্জাতিক বিচারালয়, (২) স্বাস্থ্য সংস্থা, (৩) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, (৪) ম্যানডেট সংস্থা, (৫) আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক সহযোগী সংস্থা, (৬) স্থায়ী কেন্দ্রীয় আফিং বোর্ড, (৭) উদ্বাস্তু সংস্থা, (৮) দাসদের জন্য সংস্থা। এগুলির মধ্যে অনেকগুলি সংস্থাই যখন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হল তখন সেগুলি স্থানান্তরিত হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক বিচারালয়, স্বাস্থ্যসংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থ্য ইত্যাদি।
→ আন্তর্জাতিক বিচারালয় (I.C.J.):-
লিগ কাউন্সিল এবং লিগ সভা মিলে এর নিয়ম-কানুন তৈরি করেছিল। সংস্থাটির বিচারকরা কাউন্সিল ও সভার দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিল। বিশ্বের যে-কোনও আন্তর্জাতিক সমস্যা সম্পর্কে এখানে আলোচনা ও বিচার হত। এছাড়া কাউন্সিল বা সভার পরামর্শদাতা ছিল এই সংস্থাটি। এই বিচারালয় সকল দেশের জন্য খোলা ছিল।
→ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (I.L.O.):-
ভার্সাই চুক্তির ১৩ নং অধ্যায় অনুসারে এটি স্থাপিত হয়েছিল। লিগের সমস্ত সদস্য এরও সদস্য ছিল। সংস্থাটির বার্ষিক ব্যয়বরাদ্দ অ্যাসেম্বলি বা সাধারণ সভা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত। যদিও এটি একটি স্বশাসিত সংস্থা ছিল। এবং এর নিজস্ব সচিবালয় ছিল এবং একটি পরিচালন সংস্থা ছিল। লিগের সংবিধান থেকে এর সংবিধান পৃথক ছিল। এলবার্ট টমাস ছিলেন এর প্রথম পরিচালক।
→ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাফল্য:-
দিনে আট ঘণ্টা ও সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টা কাজ, কর্মক্ষেত্রেও নারীদের অধিকার রক্ষা, শিশুশ্রম সংক্রান্ত বিষয় এবং সমুদ্রে জাহাজকর্মীদের দুর্ঘটনা হলে সেই দুর্ঘটনায় যাতে জাহাজের মালিক শ্রমিকের পরিবারের দিকে দৃষ্টিপাত করে সেই বিষয়েও নজর দিয়েছিল। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ থেকেই এটি জাতিসংঘের শাখা হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
→ লিগের স্বাস্থ্য সংস্থা (W.H.O.):-
এই সংস্থাটির আবার ৩টি শাখা ছিল। এই সংস্থাটি সারা বিশ্বজুড়ে কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া, নীতজ্বর প্রভৃতির প্রতিরোধের জন্য কাজ করেছিল এবং এই সংস্থাটি পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের এক মহামারির প্রতিরোধে যথেষ্ট ভালো ব্যবস্থা নিয়েছিল।

→ আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক সংস্থা:-
ফ্রান্সের দার্শনিক হেনরি বার্জসন ছিলেন এই সংস্থার প্রথম সম্পাদক। এই সংস্থাটি নানা ধরনের আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। যেমন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ, গ্রন্থপ্রকাশন সংক্রান্ত সহযোগিতা ও প্রত্নতাত্ত্বিক সহযোগিতা ইত্যাদি।
→ লিগের একটি স্থায়ী আফিং সংক্রান্ত সংস্থা ছিল যারা আন্তর্জাতিক স্তরে আফিং উৎপাদন ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়টি দেখত।
→ লিগের ‘দাস কমিশন’ বিশ্বে দাস ব্যবসা বন্ধে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিল। লিগ ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ইথিওপিয়াকে দাসব্যবস্থা বন্ধ করতে বলেন। এই ত্রুটি নিশ্চিত হবার পর তাকে লিগের সদস্য করেছিল।
• লিগের সদস্য:-
লিগের ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম অধিবেশনে সদস্য ছিল ৪২। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে লিগের সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছোয় এবং লিগের সদস্য সংখ্যা হয় ৬০। সোভিয়েত রাশিয়া ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে লিগের সদস্যপদ পেলেও ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে লিগের সদস্যপদ ত্যাগ করে। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে মিশর লিগের শেষ সদস্য হিসেবে উক্ত সংস্থায় যোগদান করেছিল। কোস্টারিকা ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে লিগের সদস্যপদ পেলেও ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে লিগের সদস্যপদ ত্যাগ করে। ব্রাজিল লিগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাষ্ট্র ছিল। সে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে লিগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে প্রথম সদস্যপদ ত্যাগ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে (১৯৩৯)-এর সদস্যসংখ্যা হ্রাস পেয়ে হয় ৪৬।

• লিগের ম্যানডেট ক্ষমতা:-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর জার্মানির আফ্রিকা ও প্রশান্তমহাসাগরীয় উপনিবেশগুলি এবং অটোমান সাম্রাজ্যের অ-তুর্কী প্রদেশগুলিকে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা হয়। উক্ত ম্যানডেট ব্যবস্থাকে ম্যানডেট ব্যবস্থা বলা হয়। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা, ইতালি, জাপান ইত্যাদি দশটি দেশকে উক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
লিগ তার কার্যকালের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যার সমাধান করলেও, বৃহৎশক্তি বর্গের স্বার্থ যেখানে জড়িত ছিল সেখানে লিগের ভূমিকা ছিল প্রায় দর্শকের ন্যায়। জাপানের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ, ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ বা জার্মানির আগ্রাসনে লিগ ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ফলে লিগ পতনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এমনকি লিগ যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তেমন পোক্ত করতে পারেনি।
• জাতিসংঘের বিভিন্ন তথ্য:-
(১) ১৯১৯ খিস্টাব্দে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের প্রথম অধিবেশন বসে।
(২) মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা নীতির ওপর ভিত্তি করেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
(৩) লীগের প্রধান কার্যালয় ছিল সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহর।
(৪) লীগের তিনটি সরকারি ভাষা ছিল। সেগুলি হল ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ ও ইংরেজি।
(৫) লীগের প্রথম সচিব ছিলেন স্যার এরিক ড্রমন্ট।
(৬) লীগের কার্যকালের মধ্যে লীগের তিনজন সচিব ছিলেন।
(৭) লীগের সাধারণ সভাতে তিনটি করে সদস্যরাষ্ট্র প্রতিনিধিত্ব করত।
(৮) প্রত্যেক বছর সেপ্টেম্বর মাসে লীগের সভা আহ্বান করা হত।
(৯) চারজন স্থায়ী ও চারজন অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে লীগ কাউন্সিল গঠিত ছিল।
(১০) লীগের চারটি স্থায়ী সদস্য ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান।
(১১) ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ও ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া লীগের স্থায়ী সদস্য পদ পায়।
(১২) বছরে ৫ বার লীগের অধিবেশন বসত।
(১৩) লীগের অন্যান্য সহযোগী সংস্থা হল আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা, ম্যানডেট সংস্থা, উদ্বাস্তু সংস্থা ইত্যাদি উল্লেখ্য।
(১৪) আমেরিকা কোনও দিনই লীগের সদস্যপদ গ্রহণ করেনি।
(১৫) ১৯৪৬ সালের ২৯শে এপ্রিল লীগের আনুষ্ঠানিক বিরতি হয়।