জন লক-এর রাষ্ট্র চিন্তা

জন লক-এর রাষ্ট্র চিন্তা – জন লকের রাষ্ট্র চিন্তার মূল কথা হলো সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে নাগরিকদের প্রাকৃতিক অধিকার (জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি) রক্ষা করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। লক সীমিত সরকার ব্যবস্থার সমর্থক ছিলেন এবং প্রস্তাব করেন যে যদি কোনো সরকার নাগরিকদের প্রতি তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকরা তাকে উৎখাত করার অধিকারী। তার এই চিন্তাধারা উদারনীতিবাদের ভিত্তি স্থাপন করে এবং আধুনিক গণতন্ত্রে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। 

READ MORE – জী বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তা

জন লক-এর রাষ্ট্র চিন্তা

উত্তর:-

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রথম উদারনৈতিক কাঠমো গঠন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার তাত্ত্বিক রূপকার জন লক ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে রক্তপাতহীন গৌরবময় বিপ্লবের যুগে ইংল্যান্ডের জনগণের ‘অধিকারের সনদ’ বা ‘বিল অব রাইটস’ আদায়ের ঘটনায় অভিভূত হয়ে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার নতুন এক দার্শনিক তত্ত্ব তুলে ধরতে ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে ‘টু ট্রিটিজ অব গভর্নমেন্ট’ ও ‘সেকেন্ড ট্রিটিজ’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রথম গ্রন্থে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাদর্শ ও দ্বিতীয় গ্রন্থে অভ্যন্তরীণ শাসনের বিষয়বস্তু ব্যক্ত হয়।

• রাষ্ট্র দর্শন:-

রাষ্ট্রের উৎপত্তির ব্যাপারে লক ‘সামাজিক চুক্তি’ ও প্রাকৃতিক আইনের কথা বলিলেও হবক্স বর্ণিত প্রাক্-রাষ্ট্রীয় অসহায় ও অনিশ্চিত জীবনের বিরোধিতা করেছেন। তিনি তাঁর রাষ্ট্রদর্শনে তিনটি কথা উল্লেখ করেছেন- (ক) জন-প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের প্রয়োজনীয়তা, (খ) উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থ্য ও (গ) প্রাকৃতিক আইন ও প্রাকৃতিক মৌলিক অধিকারের গুরুত্বের কথা।

• প্রাকৃতিক অধিকার:-

লক মনে করেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করত। সবাই সাম্য ও স্বাধীনতা ভোগ করত। প্রত্যেকের জীবন ছিল সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর এবং প্রত্যেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাকৃতিক আইন (Law of Nature) মেনে চলতো। সাম্যবাদী সেই সমাজে প্রাকৃতিক সম্পত্তির দখল ও ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে দ্বন্দু-অশান্তি শুরু হলে মানুষ নিজেদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্য মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল।

• সম্পত্তির অধিকার:-

লক সম্পত্তির অধিকারের কথা বলতে গিয়ে কয়েকটি কথা বলেছেন। প্রথমত, ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর সরকারের হস্তক্ষেপ অন্যায় ও অবৈধ। দ্বিতীয়ত, ঈশ্বর প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার সবাইকে দিয়েছেন। তৃতীয়ত, কোনো মানুষ নিজের শ্রমে যতটুকু সম্পত্তি ভোগ করতে পারবে ততটুকু তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে বিবেচিত হবে। চতুর্থত, প্রকৃতির ভাণ্ডারে অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে, তা যত খুশি মানুষ ভোগ করবে। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের সবটাই মানুষের ভোগের জন্য।

• শাসনক্ষমতা:-

লকের মতে চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিচালন কর্তৃপক্ষকে জনগণ নিয়োগ করে থাকে। তাই শাসনগোষ্ঠীকে জনগণের নির্দেশ মেনে জনকল্যাণমূলক কাজ করতে হবে। জনগণ চাইলেই অযোগ্য বা অদক্ষ শাসককে বিতাড়িত করতে পারবে। শাসক যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে তার জন্য তিনি ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির সুপারিশ করে বলেছেন শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগকে পৃথক পৃথক ভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে।

• সরকার:-

জন লক সরকারের কাজের প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, সরকার কিছু নিয়মনীতি মেনে আইন ও শাসন পরিচালনা করবে, বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে। সরকার রাজতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক বা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক হলেও এ নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।

• বিপ্লব ও শ্রমতত্ত্ব:-

লক ব্যক্তির শ্রমশক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, নিজের শ্রমে অর্জিত সম্পত্তি থেকে কেউ কাউকে বঞ্চিত করতে পারবে না। এভাবে তিনি উদীয়মান বুজোঁয়া শ্রেণিকে সমর্থন করেছেন। আবার সরকারের অন্যায়ের বিরোধিতা করা জনগণের অধিকার হলেও সরাসরি বিপ্লব বা বিদ্রোহকে লক সমর্থন না করে মার্কসীয় দর্শনের বিরাগভাজন হয়েছেন।

ত্রুটি-

(১) স্ববিরোধীতা:-

লক একই সঙ্গে প্রাকৃতিক অধিকার ও সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকার করে স্ববিরোধী মনোভাব ব্যস্ত করেছেন।

(২) বৈষম্যকে সমর্থন:-

আবার সাম্যের কথা বলেও সম্পত্তির অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে বৈষম্যকে সমর্থন করেছেন।

(৩) বুর্জোয়াদের সমর্থন:-

তাঁর চিন্তায় বুর্জোয়াদের প্রতি সমর্থন ছিল বলে জর্জ স্যাবাইন মনে করেন। ম্যাকফারসন তাঁকে ‘বুজোঁয়া চিন্তানায়ক’ বলেছেন।

(৪) এলিট রাজনীতির সমর্থন:-

লক পুঁজিবাদকে সমর্থন করতে গিয়ে ‘এলিট’ রাজনীতিকে প্রশয় দিয়ে সমাজের দাস, শ্রমজীবী, ভৃত্য ও সাধারণ কর্মহীনদের কিছুটা অবজ্ঞা করেছেন।

(৫) গণতন্ত্রকে খণ্ডিতকরণ:-

তিনি জনগণের ইচ্ছা ও অভিমতকে প্রাধান্য না দিয়ে গণতন্ত্রকে সীমিত ও খণ্ডিত করেছেন।

• সাফল্য:-

(১) এতদ্‌ সত্ত্বেও লক মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, স্বাধীন চিন্তা, দায়িত্বশীল সরকার, ক্ষমতা, বিভাজন নীতি, সম্পত্তির অধিকারকে তুলে ধরেছিলেন। (২) তাই, এইচ. জে. ল্যাস্কি তাঁর দ্য রাইজ অব ইউরোপিয়ন লিবারালিজম গ্রন্থে বলেছেন, ‘লকের চিন্তায় মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছিল। (৩) রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গেটেল লকের তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রিত ও বাস্তববাদী আখ্যা দিয়েছেন।

জন লক-এর রাষ্ট্র চিন্তা

Leave a Reply