গঙ্গা সাগর মেলা

গঙ্গা সাগর মেলা হল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাগরদ্বীপে অনুষ্ঠিত একটি বিখ্যাত হিন্দু তীর্থযাত্রা মেলা এবং উৎসব, যা প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির সময় (১৪ বা ১৫ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী এখানে গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে পবিত্র স্নান করতে জড়ো হন। কুম্ভ মেলার পর এটিকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা হিসেবে ধরা হয় এবং এখানে কপিল মুনি মন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। 

Table of Contents

READ MORE – ষোড়শ মহাজনপদ

গঙ্গা সাগর মেলা

ভূমিকা:-

ভারতবর্ষকে বলা হয় “তীর্থভূমি”, যেখানে ধর্ম, আচার ও সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে সহস্র বছর ধরে। এই দেশের প্রতিটি নদী, পর্বত, বনভূমি, সাগর ও তীর্থস্থান মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সেই তীর্থস্থানের মধ্যে গঙ্গা সাগর এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এখানে গঙ্গা নদী, যা হিন্দুধর্মে দেবী রূপে পূজিত, মিলিত হয়েছে অগাধ, সীমাহীন বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। এই মিলনস্থল শুধু ভৌগোলিক নয়, এটি আত্মারও মিলনক্ষেত্র—যেখানে মানুষ বিশ্বাস করে, পবিত্র গঙ্গার স্নানে সমস্ত পাপ মোচন হয় এবং মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়।

প্রতি বছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সাগর দ্বীপে অনুষ্ঠিত হয় গঙ্গা সাগর মেলা। এই দিনে সূর্য যখন মকর রাশিতে প্রবেশ করে, তখন তীর্থযাত্রীরা গঙ্গা ও সাগরের সঙ্গমস্থলে স্নান করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এই স্নান একমাত্র মুক্তির পথ। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশ্বাস অটুট, এবং তাই প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ-বিদেশ থেকে এখানে ছুটে আসেন—ভক্তি, আনন্দ ও আশার আলো নিয়ে।

গঙ্গা সাগর মেলা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক মহাসাংস্কৃতিক উৎসবও। এখানে ধর্ম, সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ ও প্রশাসন সবই একসঙ্গে যুক্ত হয়ে এক মানবিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। তাই বলা হয়—“সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার।”

(i)গঙ্গা সাগরের ভৌগোলিক অবস্থান-

গঙ্গা সাগর মেলার কেন্দ্রবিন্দু হলো সাগর দ্বীপ, যা পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ প্রান্তে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় অবস্থিত। এটি গঙ্গার মোহনা অঞ্চলে অবস্থিত একটি দ্বীপ, যেখানে গঙ্গার একটি প্রধান শাখা, হুগলি নদী, বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এই স্থানটিকেই বলা হয় “গঙ্গাসাগর সঙ্গম”।

কলকাতা থেকে গঙ্গা সাগরের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে তীর্থযাত্রীদের প্রথমে যেতে হয় নামখানায়, তারপর ফেরিতে নদী পার হয়ে কচুবেরিয়া, সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে কপিল মুনির আশ্রম পর্যন্ত। এই পুরো যাত্রাপথই তীর্থযাত্রীদের কাছে এক সাধনার অংশ, যেখানে কষ্টের মধ্যেও থাকে ভক্তির আনন্দ।

সাগর দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ এক অনন্য সৌন্দর্যে ভরা। একদিকে নীল সাগর, অন্যদিকে শান্ত নদী, মাঝে সবুজ বন ও বালুকাবেলা—এই মিশ্র প্রকৃতি গঙ্গা সাগরকে করেছে এক পবিত্র ও চিত্তাকর্ষক স্থান। এই অঞ্চলটি সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার জলবায়ু ও প্রকৃতি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ।

(ii)পৌরাণিক ইতিহাস ও ধর্মীয় গুরুত্ব-

গঙ্গা সাগরের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং ভারতীয় পুরাণ, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।

রাজা সগর ও কপিল মুনির কাহিনি:-

বিষ্ণুপুরাণ ও রামায়ণ অনুসারে, রাজা সগর ছিলেন এক পরাক্রমশালী রাজা। তাঁর ষাট হাজার পুত্র ছিল। তিনি এক অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং সেই যজ্ঞের ঘোড়া পৃথিবী জুড়ে পাঠান। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র ঈর্ষান্বিত হয়ে সেই ঘোড়াটিকে লুকিয়ে রাখেন কপিল মুনির আশ্রমে।

সগরের পুত্ররা ঘোড়াটির খোঁজ করতে করতে কপিল মুনির আশ্রমে এসে দেখে ঘোড়াটি সেখানে আছে। সন্দেহবশত তারা মুনিকে অভিযুক্ত করে, এবং রুষ্ট হয়ে মুনিকে অপমান করে। এতে কপিল মুনি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের ভস্ম করে দেন।

পরবর্তীকালে রাজা সগরের পৌত্র ভগীরথ কঠোর তপস্যা করেন গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আনতে, যাতে তাঁর পূর্বপুরুষদের আত্মা মুক্তি লাভ করে। অবশেষে গঙ্গা স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ হয়ে কপিল মুনির আশ্রমে এসে সাগরে মিশে তাঁদের আত্মাকে মুক্তি দেয়। সেই স্থানই বর্তমান গঙ্গা সাগর।

এই কারণেই গঙ্গা সাগরের জলকে “মোক্ষদায়িনী” বলা হয়—যেখানে স্নান করলে মানুষ পাপমুক্ত হয় এবং আত্মা পবিত্র হয়।

(iii) ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গার অবতরণ:-

ভগীরথের তপস্যা ভারতীয় সংস্কৃতিতে ভক্তি ও দৃঢ়তার প্রতীক। বলা হয়, ভগীরথ বহু বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেন। অবশেষে ব্রহ্মা গঙ্গাকে পৃথিবীতে পাঠাতে রাজি হন, কিন্তু শর্ত দেন যে, গঙ্গার প্রবল স্রোত পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলবে যদি কেউ তা ধারণ না করে। তখন ভগীরথ শিবের কাছে প্রার্থনা করেন। শিব তাঁর জটায় গঙ্গাকে ধারণ করেন এবং পরে ধীরে ধীরে গঙ্গাকে পৃথিবীতে প্রবাহিত করেন।

এই কাহিনি শুধু একটি ধর্মীয় উপাখ্যান নয়; এটি মানবজীবনের এক প্রতীক—ধৈর্য, বিশ্বাস ও সাধনার। এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র গঙ্গা সাগরের ধর্মীয় গুরুত্বকে বহন করে চলেছে আজও।

(iv) গঙ্গা সাগর মেলার সময় ও ধর্মীয় আচার-

প্রতি বছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে, সূর্য যখন মকর রাশিতে প্রবেশ করে, তখনই এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় শীতের শেষ প্রান্তে, আকাশ নির্মল, বাতাসে এক উৎসবের আবহ বিরাজ করে। সারা দেশ থেকে তীর্থযাত্রীরা ট্রেন, বাস, নৌকা, এমনকি পদব্রজে এসে এখানে উপস্থিত হন।

মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো গঙ্গা সাগরে স্নান। ভোরবেলা সূর্যোদয়ের আগে-পরে লক্ষাধিক মানুষ একসঙ্গে স্নান করেন। তারপর তারা যান কপিল মুনির আশ্রমে পূজা দিতে। বহু সাধু-সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসিনী ও ভক্ত একত্রিত হয়ে ভজন, কীর্তন, ধ্যান, যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

এছাড়াও এখানে নানা ধর্মীয় রীতিনীতি পালিত হয়—অস্থি বিলুপ্তি, পিণ্ডদান, দান, ব্রতপালন ইত্যাদি। অনেকেই তাদের পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তির জন্য এখানে পুণ্যস্নান করেন।

(v) ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার ও সাধুসমাগম-

গঙ্গা সাগর মেলা মূলত ধর্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মানুষের গভীর বিশ্বাস — “গঙ্গা সাগরে একবার স্নান করলে সমস্ত পাপ মোচন হয় এবং মুক্তি লাভ হয়।”

এই মেলার প্রধান আচার হলো স্নান। মকর সংক্রান্তির দিন সূর্যোদয়ের আগে-পরে লক্ষাধিক মানুষ গঙ্গা ও সাগরের সঙ্গমস্থলে স্নান করে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই সময় সূর্য ও গঙ্গা দেবীর মিলনে প্রকৃতি সর্বাধিক পবিত্র থাকে।

স্নানের পর তীর্থযাত্রীরা যান কপিল মুনির আশ্রমে পূজা দিতে। আশ্রম প্রাঙ্গণে চলে যজ্ঞ, আরতি, ভজন ও প্রসাদ বিতরণ। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ধর্মীয় আচার চলতে থাকে।

(vi) সাধু ও সন্ন্যাসীদের আগমন:-

প্রতি বছর এই মেলায় হাজার হাজার সাধু-সন্ন্যাসী আসেন—কাশী, হরিদ্বার, রিষিকেশ, পুরী, অযোধ্যা, উজ্জয়িনীসহ ভারতের প্রায় সব পবিত্র স্থান থেকে। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন নাগা সাধু, যাঁদের নগ্ন দেহ ছাই দিয়ে আবৃত থাকে। তাঁরা ভক্তি ও বৈরাগ্যের প্রতীক।

মেলায় বিভিন্ন স্থানে সাধুদের ধর্মসভা ও উপদেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাঁরা ধর্ম, নীতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার বার্তা প্রচার করেন। অনেক সাধু বিনামূল্যে ‘লঙ্গর’ বা আহার বিতরণ করেন। এসব দৃশ্য মেলাকে এক আধ্যাত্মিক তীর্থযাত্রায় পরিণত করে।

(vii)  সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব-

গঙ্গা সাগর মেলা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এখানে সমাজের নানা স্তরের মানুষ একত্রিত হয়—ধনী-গরিব, শহুরে-গ্রামীণ, হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ—সবাই একই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে অংশ নেয়।

এই মিলনই প্রমাণ করে যে, ভারতীয় সমাজের অন্তরে যে একতা ও সহমর্মিতা আছে, তা ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির মাধ্যমেই সর্বাধিক প্রকাশ পায়।

(viii) লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য-

গঙ্গা সাগর মেলায় দেখা যায় বাংলার লোকসংস্কৃতির নানা রূপ। এখানে লোকগীতি, কীর্তন, বাউল গান, নাটক, পুতুলনাচ, লোকনৃত্য ইত্যাদি পরিবেশিত হয়। স্থানীয় শিল্পীরা তাঁদের হস্তশিল্প, শাঁখা, পাটি, মাটির পুতুল, কাঠের জিনিস, ধূপ-চন্দন বিক্রি করেন। ফলে এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও অর্থনীতিরও প্রাণকেন্দ্র।

এখানে শুধু ধর্ম নয়, মানুষের সহযোগিতা, সহানুভূতি ও একতার বার্তা ফুটে ওঠে। একে অপরকে সাহায্য করা, অজানা মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করা—এই মানবিক চেতনা গঙ্গা সাগর মেলাকে এক অদ্বিতীয় সামাজিক উৎসবে পরিণত করেছে।

(ix)  অর্থনৈতিক ও পর্যটনমূলক গুরুত্ব-

গঙ্গা সাগর মেলা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ তীর্থযাত্রী এখানে আসে। তাঁদের জন্য খাদ্য, পানি, আশ্রয়, যাতায়াত, চিকিৎসা, যোগাযোগ ইত্যাদি পরিষেবা প্রদান করতে সরকার ও স্থানীয় মানুষ উভয়ই যুক্ত থাকে।

(x) স্থানীয় অর্থনীতি-

মেলার সময় সাগর দ্বীপের অর্থনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। হাজার হাজার অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল, পোশাক, ধর্মীয় সামগ্রী, ফুল, ধূপ, মালা, মাটির পাত্র, ইত্যাদি বিক্রি হয়। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বেড়ে যায়।

সরকারি হিসেবে, মেলা চলাকালীন কয়েকশো কোটি টাকার লেনদেন হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পর্যটন খাত—হোটেল, লজ, ফেরি সার্ভিস, বাস পরিবহন, নৌকা, গাইড ইত্যাদি।

(xi) পর্যটন ও আন্তর্জাতিক আগ্রহ-

গঙ্গা সাগর এখন শুধু তীর্থযাত্রীদের নয়, সাধারণ পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে। ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয় এটিকে “অন্তর্জাতিক ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র” হিসেবে উন্নয়নের চেষ্টা করছে। বিদেশ থেকেও বহু ভক্ত এখানে আসেন—বিশেষত নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে।

মেলার সময় টেলিভিশন, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে গঙ্গা সাগরের মনোরম দৃশ্য সম্প্রচারিত হয়, যা বাংলার পর্যটন শিল্পকে আরও প্রসারিত করছে।

(xii) প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা-

লক্ষাধিক মানুষের আগমনের কারণে গঙ্গা সাগর মেলার জন্য প্রশাসনের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, নৌবাহিনী, সিভিল ডিফেন্স, স্বাস্থ্যকর্মী, এনজিও—সবাই মিলিতভাবে এক বিশাল অপারেশন পরিচালনা করে।

(xiii)  নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা

পুরো মেলাক্ষেত্রে স্থাপন করা হয় কন্ট্রোল রুম, সিসিটিভি নজরদারি, ড্রোন পর্যবেক্ষণ।

পুলিশ, এনডিআরএফ ও কোস্টগার্ড দল মোতায়েন থাকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে।

“লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড” কেন্দ্র থাকে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের সাহায্যের জন্য।

পরিবহন ব্যবস্থায় ফেরি, বাস, গাড়ি, মোটরবোটের বিশেষ সার্ভিস দেওয়া হয়।

(xiv) স্বাস্থ্যসেবা-

মেলার সময় স্থাপন করা হয় অস্থায়ী হাসপাতাল ও মেডিকেল ক্যাম্প। এখানে চিকিৎসক, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স ও ওষুধের ব্যবস্থা থাকে। পানীয়জল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে মহামারি বা সংক্রমণ না ঘটে।

(xv) পরিবেশরক্ষা ব্যবস্থা-

বিগত কয়েক বছরে সরকার বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে সবুজ গঙ্গা সাগর মেলা গড়ে তোলার ওপর। প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ব্যবহার করা হচ্ছে বায়ো-টয়লেট, এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। নদী ও সাগরের জলে দূষণ রোধে নেওয়া হয়েছে আধুনিক পদক্ষেপ।

(xvi) পরিবেশ, প্রকৃতি ও জলবায়ু-

গঙ্গা সাগর এলাকা প্রাকৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের নিকটবর্তী অঞ্চল। এখানকার নদী, ম্যানগ্রোভ বন, পাখি, মাছ ও জীববৈচিত্র্য প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ।

তবে মেলার সময় লক্ষাধিক মানুষের আগমন পরিবেশে কিছুটা চাপ ফেলে—বর্জ্য ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহার, যানবাহনের ধোঁয়া ইত্যাদি কারণে। তাই পরিবেশবিদরা সবসময় সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষ যৌথভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিচ্ছেন—

মেলায় “সবুজ দূত” নামের স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন হয়েছে।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

নদী ও সাগর পরিষ্কারের জন্য ড্রেজিং ও জলপরিশোধন ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গঙ্গা সাগর তাই এখন ধর্ম ও পরিবেশের মিলনক্ষেত্র—যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও প্রকৃতি হাতে হাত মিলিয়ে চলছে।

(xvii)  মানবিকতা, ঐক্য ও সহমর্মিতা-

গঙ্গা সাগর মেলার সবচেয়ে গভীর বার্তা হলো মানবিকতা। এখানে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল—সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই একত্রিত হয় এক বিশ্বাসে।

অজানা মানুষদের সাহায্য করা, বৃদ্ধ তীর্থযাত্রীকে হাত ধরে স্নানে নিয়ে যাওয়া, অন্যের জন্য খাবার বা পানি ভাগ করে নেওয়া—এই সমস্ত ছোট ছোট কাজই মানবতার বৃহৎ প্রতীক।

এখানে দেখা যায় সহানুভূতি ও সহমর্মিতার এমন দৃশ্য, যা ধর্মের প্রকৃত অর্থকে স্মরণ করিয়ে দেয়—সেবাই সর্বোচ্চ ধর্ম।

(xviii) সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গঙ্গা সাগর-

গঙ্গা সাগরের প্রভাব ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও গভীর।

বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন, বিভূতিভূষণ প্রমুখ লেখক তাঁদের রচনায় গঙ্গার পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতাকে তুলে ধরেছেন। বাংলার লোকগানে আছে এমন লাইন—

“গঙ্গার জলে ডুব দিলে মুছে পাপের রেণু,

সাগরে মিলে মন আমার পায় মুক্তি ধেনু।”

আধুনিক যুগেও কবি ও গায়করা গঙ্গা সাগরের মাহাত্ম্য নিয়ে গান রচনা করছেন। চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রেও গঙ্গা সাগরের সৌন্দর্য ও মানবিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

(xix) বর্তমান যুগে গঙ্গা সাগর মেলার প্রাসঙ্গিকতা-

প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিকতার যুগেও গঙ্গা সাগর মেলা তার গুরুত্ব হারায়নি। বরং প্রতিবছর দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।

এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের ভিতরে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট। মানুষ আজও বিশ্বাস করে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে, সেবা ও বিশ্বাসে মুক্তি সম্ভব।

এছাড়াও মেলাকে কেন্দ্র করে সরকার “গঙ্গাসাগর উন্নয়ন প্রকল্প” চালু করেছে—যাতে উন্নত রাস্তা, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।

(xx) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব-

গঙ্গা সাগর মেলা কেবল ধর্মীয় নয়, এটি এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এখানে মিলিত হয়, ফলে সৃষ্টি হয় একতা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বন্ধন।

বিভিন্ন লোকসংগীত, নাট্য, নৃত্য, হস্তশিল্প, লোকজ পণ্য—সব মিলিয়ে এটি পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতিরও এক বৃহৎ প্রদর্শনী। এই মেলায় স্থানীয় শিল্পীরা তাঁদের কাজ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে এটি অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

(xxi) অর্থনৈতিক ও পর্যটনমূলক গুরুত্ব-

গঙ্গা সাগর মেলা পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ তীর্থযাত্রী এখানে আসেন। তাদের জন্য পরিবহন, খাদ্য, পানীয়, থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসা ইত্যাদি তৈরি করতে সরকার ও বেসরকারি সংস্থা মিলিতভাবে কাজ করে। ফলে হাজার হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান হয়

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেলার সময় স্থানীয় ব্যবসা, হোটেল, দোকান, ফেরি, ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদিতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। গঙ্গা সাগর তাই শুধু ধর্মের স্থান নয়, এটি অর্থনীতিরও উৎসব।

(xxii)  প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা-

প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের আগমনের কারণে প্রশাসনেরও বিশাল প্রস্তুতি নিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার মেলার আগে থেকেই পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, এনজিও ও নৌবাহিনীকে নিয়োজিত করে।

স্বাস্থ্য ক্যাম্প, ফ্রি মেডিকেল টেন্ট, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড ক্যাম্প, নিরাপত্তা টাওয়ার, কন্ট্রোল রুম, ড্রোন নজরদারি ইত্যাদি ব্যবস্থার মাধ্যমে তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। পরিবেশ রক্ষার জন্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

(xxiii) পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক-

গঙ্গা সাগর এলাকা একটি সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম—এখানে নদী, সাগর ও বনাঞ্চল একত্রে রয়েছে। প্রতিবার লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বর্তমানে সরকার পরিবেশবান্ধব মেলার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে—বায়ো-টয়লেট, প্লাস্টিকবিরোধী প্রচার, এবং সবুজ ক্যাম্পাস তৈরির মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।

(xxiv)  মানবিকতা ও সহমর্মিতার উৎসব-

গঙ্গা সাগর মেলার আরেকটি বিশেষ দিক হলো মানবিকতা। এখানে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষা—সব বিভাজন ভুলে সবাই একত্রিত হয়। একে অপরকে সাহায্য করা, অজানা লোকের জন্য খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা—এসবই ভারতীয় সংস্কৃতির চিরন্তন মানবতার বার্তা বহন করে।

উপসংহার –

গঙ্গা সাগর মেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিকতার প্রতীক। গঙ্গা ও সাগরের মিলন যেমন প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি, তেমনি এই মেলা মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও ঐক্যের প্রতীক।

প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম এই সত্য প্রমাণ করে যে, যুগ বদলালেও ভক্তি ও বিশ্বাসের শক্তি আজও অমলিন। গঙ্গা সাগর মেলা তাই আজও আমাদের শেখায়—পবিত্রতা শুধু জলে নয়, মানবতার সেবাতেই নিহিত।

গঙ্গা সাগর মেলা

Leave a Reply