You are currently viewing কয়েকটি ইউরোপের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ (SOME EUROPEAN HISTORICAL INCIDENT)
(SOME EUROPEAN HISTORICAL INCIDENT)

কয়েকটি ইউরোপের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ (SOME EUROPEAN HISTORICAL INCIDENT)

কয়েকটি ইউরোপের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ (SOME EUROPEAN HISTORICAL INCIDENT) (1689-1930) ইউরোপের ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।  এই ঘটনাগুলো ইউরোপের পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, এবং সংস্কৃতির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

কয়েকটি ইউরোপের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ (SOME EUROPEAN HISTORICAL INCIDENT) (1689-1930)

1)ফরাসি স্বৈরাচার ও অর্থনৈতিক নীতি বিষয়ে দার্শনিকদের সমালোচনা

বিপ্লব পূর্ববর্তী ফ্রান্সে ক্ষোভ, অসন্তোষ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক অহমিকা, দন্ত ও হিংসা সমাজে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করে, যা বিশেষ পরিস্থিতির চাপে বিপ্লবের আকার নেয়। তবে বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন হয় মানসিক প্রস্তুতি। এই মানসিক প্রস্তুতি সৃষ্টি করেন বুদ্ধিজীবী দার্শনিক শ্রেণি। তাঁদের সমালোচনার ফলেই ফ্রান্সের জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। এই দার্শনিকগণ যুক্তি ও তথ্য সহকারে অবহেলিত শোষিত মানুষকে নতুন পথের সন্ধান দেন। এই দার্শনিকদের মধ্যে মন্তেচ্ছু, ভলতেয়ার, রুশো, ডেনিস দিদেরো, কুয়েসনে, এলেমবার্ট প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ছিলেন।

মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ):

মস্তেডু তাঁর ‘পার্সিয়ান লেটারস’ (১৭২১) গ্রন্থে ফ্রান্সে ভ্রমণরত দুজন ব্যক্তির কল্পিত চিঠিপত্রের মাধ্যমে বিপ্লব-পূর্ববর্তী ফ্রান্সের অবস্থা ব্যঙ্গ রসের মধ্যে দিয়ে পরিবেশিত করেন। এই গ্রন্থে তিনি স্বৈরাচারী ফরাসি রাজতন্ত্র, রাজপরিবার ও প্রতিনিধিসভার দুর্নীতি ও কার্যকলাপ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অধিকারভোগী অভিজাততন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘স্পিরিট অব লজ’ (১৭৪৮) বা আইনের মর্মকথায় বা নিহিতার্থ শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা বিভাজন নীতির বিশ্লেষণ করেছেন।

তিনি মনে করতেন রাজার ঈশ্বরপ্রাপ্ত ক্ষমতা নয়-ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শাসন, আইন ও বিচারবিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভাজন কাম্য। তা না হলে স্বৈরতন্ত্রকে রোখা যাবে না। তবে তিনি যাজক ও অভিজাত শ্রেণির বিশেষ অধিকার বিলোপের কথা বলেননি। এছাড়াও তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার সম্পর্কে কোনো কথা বলেননি। তা সত্ত্বেও তাঁর রচনা তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক তর্ক বিতর্কের এক ব্যাপক প্রেরণা জুগিয়েছিল।

ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ):

আসল নাম মারি ফাঁসোয়া আরুয়েৎ। তিনি চার্চের দুর্নীতি ও গোঁড়ামির কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি তাঁর ‘লেতর ফিলজফিক’ বা ‘ফিলজফিক্যাল লেটার্স’ গ্রন্থে অন্ধ কুসংস্কার ও চার্চের অনাচারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। চার্চও তাঁর এই সমালোচনার জন্য তাঁকে ক্ষমা করেনি। তিনি তাঁর অন্যতম ‘কাঁদিদ’ গ্রন্থে জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারের কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন মানুষের জন্মগত অধিকারকে বলবৎ করতে হলে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমিত করা প্রয়োজন। তবে তিনি গণতন্ত্রকে সমর্থন করেননি এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিয়ে ভাবেননি।

▶ রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ):

রুশো দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে জন্মগত অধিকার সমাজের ভিত্তি হতে পারে না। সমাজ নির্ভর করে জনসাধারণের সম্পত্তির ওপর। এইসব বিষয় নিয়ে তিনি ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন সামাজিক চুক্তি’ বা ‘সোশ্যাল কনট্রাক্ট’ গ্রন্থ। তিনি এই গ্রন্থে বলেন যে আদিম যুগ থেকে মানুষ, এক অলিখিত চুক্তি দ্বারা ব্যক্তিবিশেষকে শাসনপদ দান করেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র হল জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। রাজা নিজ কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বৈধ অধিকার মানুষের রয়েছে। তাঁর বক্তব্য প্রচলিত রাজতন্ত্রের দৈবসত্ব অধিকারের মূলে আঘাত করে। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলি হল ‘এমিলি’, ‘নুভেল এলোয়া’, ‘এ ডিসকোর্স অল আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’, ‘এ ডিসকোর্স অন ইনইকুয়ালিটি’। তাঁর আত্মজীবনী ‘কনফেশনস’।

▶ ডেনিস দিদেরো (১৭১৩-১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ):

রাষ্ট্র ও চার্চের অন্যায়ের কঠোর সমালোচনা করেন। দার্শনিক মাবলি (১৭০৯-১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) ফরাসি সমাজ ও অর্থব্যবস্থার বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি রাজতন্ত্রের পরিবর্তে প্রজাতন্ত্রকে স্বাগত জানান। মেসলিয়ে (১৬৬৪-১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দ) যাজকতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, রাজতন্ত্র সব কিছুরই তীব্র সমালোচনা করেন।

এছাড়া অবাধ বাণিজ্যনীতি বা ফিজিওক্র্যাট মতবাদের প্রবক্তা কুয়েসনে (১৬৯৪-১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ), যিনি পঞ্চদশ লুই-এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মিরাবো (১৭৪৯-৯১ খ্রিস্টাব্দ), তুর্গো (১৭২৭-৮১ খ্রিস্টাব্দ), নেমুর (১৭৩৯-১৮১৯ খ্রিস্টাব্দ), গুরনে (১৭১২-১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রমুখ ফ্রান্সে প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁরা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণমুক্ত অবাধ বাণিজ্যনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে ফরাসি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার অভিমত ব্যক্ত করেন। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ‘The wealth of Nations’ গ্রন্থে ফিজিওক্র্যাট মতবাদ সর্বপ্রথম প্রচার করেন।

READ MORE – ইউরোপের ঘটনা (European events) (1937-1945)

2)টেনিস কোর্টের শপথ ১৭৮৯ সালের ২০ জুন (Tennis Court Oath)

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন পরবর্তী ঘটনা ঘটে। রাজা ষোড়শ লুই সভার অধিবেশন স্থগিত রাখেন। তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ বন্ধ দেখে ক্ষুব্ধ হন এবং দুই নেতা অ্যাবে সিয়েস ও মিরাবো-র নেতৃত্বে সন্নিহিত এক টেনিস খেলার মাঠে সমবেত হয়ে শপথ নেন যে, যতদিন না ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচিত হয় ততদিন তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। এবং ওই দুর্গের গভর্নর দলোন-কে গ্রেপ্তার করে। তৃতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ টেনিস খেলার মাঠে শপথ নিয়েছিল বলে এই ঘটনা টেনিস কোর্টের শপথ নামে পরিচিত। এই ঘটনা ছিল প্রত্যক্ষ রাজ-বিরোধিতার দৃষ্টান্ত।

২৩ জুন ষোড়শ লুই একটি রাজকীয় অধিবেশন আহ্বান করে তৃতীয় শ্রেণির সব ধরনের কাজকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেন। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে এক বিশাল জনতার রাজপ্রাসাদ (টুইলারিস) আক্রমণ করার সংবাদে রাজা ভীত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ২৭ জুন তিনি তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিদের দাবি অনুসারে মাথাপিছু ভোটের দাবি এবং তিন শ্রেণির একত্রে অধিবেশন মেনে নেন। এইভাবে অঁসিয়া রেজিমে বা পুরাতনতন্ত্রের পতনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিদের বিশেষত আইনজীবী, শিল্পপতি, শিক্ষক, চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশার মানুষের দাবি জয়যুক্ত হয়। সেইজন্য এই ঘটনা বুর্জোয়া বিপ্লব নামেও পরিচিতি লাভ করে।

ফরাসি বিপ্লবের সূচনার পূর্বে এক অন্যতম ঘটনা ছিল টেনিস কোর্ট শপথ। সুদীর্ঘ ১৭৫ বছর পরে ফ্রান্সের ভাসাই শহরে স্টেটস্ জেনারেল বা জাতীয় মহাসভার অধিবেশন বসে (১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ৫ মে) কিন্তু কয়েকদিন ধরে চলা এই অধিবেশনে সদস্যদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নটি জাতীয় সংকটের সৃষ্টি করে। অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায় চেয়েছিল দলগত ভোট হোক আর তৃতীয় সম্প্রদায় চেয়েছিল ব্যক্তি হিসেবে অর্থাৎ মাথাপিছু ভোটাধিকার।

সম্রাট ষোড়শ লুই ফ্রান্সের অর্থসংকট থেকে মুক্তি পেতে জাতীয় মহাসভার (স্টেটস্ জেনারেল ১৩০২ খ্রিস্টাব্দে ফিলিপ দ্য ফেয়ার স্টেটস্ জেনারেল প্রতিষ্ঠা করেন) অধিবেশনে আহ্বান করেন। সভার আলোচ্য বিষয়ের পরিবর্তে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে তৃতীয় সম্প্রদায় মাথাপিছু ভোটাধিকারের দাবি জানানোর পাশাপাশি একটি নতুন শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করতে চায় এবং ‘স্টেটস্ জেনারেল’-কে জাতীয় পরিষদ বলে ঘোষণা করে। তাঁরা এও দাবি জানান যে, কর ধার্য করার অধিকার একমাত্র তাঁদেরই আছে।

ক. উদ্দেশ্য:

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সম্রাট ঘোড়শ লুই ২০ জুন (১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে) অধিবেশন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন যাতে গণপতিনিধিরা কক্ষে প্রবেশ করতে না পারে। ফলে ক্ষুদ্ধ গণপ্রতিনিধিরা মিরাবো ও আবেসিয়াসের নেতৃত্বে সভাকক্ষের পাশেই টেনিস খেলার মাঠে অধিবেশন আয়োজন করে।

খ. গ্রহণ:

টেনিস খেলার মাঠে গণপ্রতিনিধিরা শহথ গ্রহণ করে বলেন-ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন শাসনতন্ত্র রচনা ও সুশাসন প্রবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আমরা অধিবেশন কক্ষে সভা করব না। প্রয়োজনে এইখানেই সভা পরিচালনা করব। এই ঘটনা টেনিস কোর্ট শপথ নামে পরিচিত। তৃতীয় সম্প্রদায়ের নেতা মিরাবো রাজাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন-আমরা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বহিষ্কার করা হলে বলপ্রয়োগ করা ছাড়া আমাদের জন্য কোনো উপায় নেই।

শেষ পর্যন্ত তৃতীয় সম্প্রদায়ের দাবিগুলি, যথা-১. তিন সম্প্রদায়ের একত্রে অধিবেশন ২. তৃতীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের মাথাপিছু ভোটের দাবি ৩. ‘স্টেটস্ জেনারেল’-কে ‘জাতীয় পরিষদ’ হিসেবে ঘোষণা এবং ৪. একটি শাসনতন্ত্র রচনার অধিকার ইত্যাদি রাজা মেনে নিতে বাধ্য হন (১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে, ২৭ জুন)।

READ MORE – জাতিসংঘ (United Nations) (1920)

3)বাস্তিল দুর্গের পতন ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই

বুর্জোয়াদের দাবি মেনে জাতীয় সভা গঠনের কাজ সম্পূর্ণ হলে প্যারিস ও ভার্সাই-এর সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনার পাশাপাশি আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু রাজা ও অভিজাতশ্রেণি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ষোড়শ লুই বুর্জোয়াদের দমন করার জন্য প্যারিস ও ভার্সাই-এর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে সেনা মোতায়েন করেন। ১১ জুলাই রাজা জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকারকে পদচ্যুত করলে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। প্যারিসের সর্বত্রই খাদ্যের দাবিতে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, কৃষক প্রভৃতিরা বিদ্রোহ শুরু করে।

বিপ্লবী মানুষ এইসময় চল্লিশটি শুল্ক ফটক ভেঙে দেয়, আগ্নেয়াস্ত্রের দোকানে লুঠতরাজ চালায়। ১৪ জুলাই প্রায় ৮০০০ উত্তেজিত জনতা স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র ও অত্যাচারী সামন্ততন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে দখল করে নেয়। তারা কারাগারের রক্ষী ও অন্যান্য কর্মচারীদের হত্যা করে এবং বন্দিদের মুক্ত করে। বাস্তিল দুর্গ আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করা বন্দি মুক্তি নয়। কারণ এই দূর্গে বন্দির সংখ্যা ছিল সাতজন এবং তাঁরা দরিদ্র মানুষ ছিল না।

বাস্তিলের পতন ফ্রান্সে রাজকীয় স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটায়। বাস্তিল দুর্গের পতনের সময় থেকেই ফ্রান্সে সংবাদপত্রের ওপর সরকারি বাধা-নিষেধ উঠে যায়; এই সময় থেকে স্বাধীন সাংবাদিকতার সূচনা হয়। কেবল ফ্রান্সে নয়, সারা বিশ্বে বাস্তিল দুর্গেরপতনের ঘটনা সমাদৃত হয়েছিল। বাস্তিলের পতনে রাজা ও অভিজাতশ্রেণির মনোবল ভেঙে যায়।

4)সাধারণ মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা

বিপ্লবী নেতা মিরাবো, বারনেভ, লাফায়েৎ, রোবসপিয়ের প্রমুখের চেষ্টায় জাতীয় সভা সংবিধান সভায় রূপান্তরিত হয়। এই সংবিধান সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট মানুষ ও নাগরিকের অধিকার সমূহের ঘোষণা। ইংল্যান্ডের বিল অব রাইটস (১৬৮৭ খ্রিঃ) ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র (১৭৭৬ খ্রিঃ)-এর অনুকরণে সংবিধান সভা এই ঘোষণাপত্র রচনা করে। এই ঘোষণাপত্রকে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের সংবিধানের প্রস্তাবনা বলা হয়ে থাকে। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয় যে-

(১) স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার।

(২) আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকই সমান।

(৩) বাক্-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তি ক্রয়বিক্রয় প্রভৃতি মানুষের সর্বজনীন অধিকার।

(৪) রাজা নন, জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। এই ঘোষণাপত্র শুধু ফ্রান্সের ইতিহাসেই নয়, সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

5)১৭৯১ সালের নতুন ফরাসি সংবিধান

বিপ্লবকালে ফ্রান্সের জাতীয় সভা সংবিধান সভায় রূপান্তরিত হয়েছিল। এই সভার মূল কাজ ছিল নতুন ফরাসি সংবিধান রচনা করা। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দু-বছরের চেষ্টায় সংবিধান সভা নতুন সংবিধান রচনা করে ১৭৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দীর্ঘ সময় ধরে সংবিধান রচনার কাজ চালালেও সংবিধান রচয়িতারা প্রথমদিকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। (১) সামন্ততন্ত্রের বিলোপ এবং (২) নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের ঘোষণা।

সামন্ততন্ত্রের বিলোপ: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট সংবিধানসভা এক ঘোষণা মারফত ফ্রান্সে সামন্ততন্ত্রের বিলোপ করে। এই ঘোষণায় ফ্রান্সে সামন্তব্যবস্থা লোপ করা হয়, ভূমিদাস প্রথা, বেগার শ্রম প্রথা লোপ করা হয়, সামন্তদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা লোপ করা হয়, টাইদ বা ধর্মকর, সামন্তকর বা কর্তি লোপ করা হয়। বলা বাহুল্য ১৭৮৯ সালের ৪ থেকে ১১ আগস্ট-এর মধ্যে মোট ৩০টি ডিক্রী জারি করে ফ্রান্সে সামন্ততন্ত্রের সৌধ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ঐতিহাসিক গুডউইন বলেছেন যে-৪ আগস্ট-এর ঘোষণা পুরাতনতন্ত্রের ভিত্তিতে নাড়া দিলেও, এই প্রক্রিয়া ছিল অসম্পূর্ণ।

কারণ অভিজাতরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই উদারতা দেখায়নি। তাই অল্পকালের মধ্যেই জনতাকে আবার বিপ্লবমুখী হতে হয়েছিল। সর্বপরি ৪ আগস্ট-এর ঘোষণা গুলিকে রাজা ষোড়শ লুই গ্রহণ করতে অসম্মত হন। স্বভাবতই রাজার আচরণ ফ্রান্সের জনগণকে সন্দিহান করে তুলেছিল। ৫ আগস্ট কয়েক হাজার মহিলা বিশাল মিছিল বের করেছিল খাদ্যের দাবিতে। তারা ভার্সাই প্রাসাদে অভিযান করেছিল এই সময়। ৬ আগস্ট উত্তেজিত মিছিল কারীরা রাজার দেহরক্ষীদের হত্যা করে প্রাসাদে প্রবেশ করেছিল।

▶ নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের ঘোষণা:

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট ব্যক্তি ও নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ঘোষিত হয়। এই ঘোষণায় স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার, মানুষে মানুষে অধিকার ভেদের অবসান, সকল মানুষের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দৃঢ় করা, বাক্-স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিচারের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা এইসব নতুন আদর্শ প্রচারিত হয়। এই ঘোষণায় সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা এই তিন আদর্শ স্বীকৃতি পেয়েছিল।

▶ শিক্ষা-সংস্কৃতি জগতে প্রভাব:

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতে ফসাসি বিপ্লবের প্রভাব পড়েছিল। জাতীয় শিক্ষা হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের নাগরিক গড়ে তোলা।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে ফরাসি বিপ্লব এক নতুন ধারা ও শৈলীর সৃষ্টি করেছিল। বিপ্লবের নানা ঘটনা সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের চিন্তার খোরাক জোগায়। দুকিশ, আর্নল্ট, দেলাইলি প্রমুখ সাহিত্যিক নতুন ধরনের লেখায় ফরাসি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। শিল্প জগতে দাভিদ এক নতুন ধরনের ধারার প্রবর্তন করেন। তাঁর আঁকা ‘টেনিস কোর্ট শপথ’ এক অনবদ্য সৃষ্টি। ফরাসি বিপ্লব সাহিত্য ও শিল্পকলার তুলনায় সংগীতকে বেশি প্রভাবিত করেছিল। গোসেক, মেহুল, গ্রেত্রের মতো শিল্পীরা সংগীত জগৎকে আলোকিত করেছিলেন।

১৭৯১ সালের নতুন সংবিধানে: ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রক রাজতন্ত্র চালু করা হয়। এক ঘোষণা দ্বারা ‘ফ্রান্সের রাজা’ এই উপাধির পরিবর্তে রাজাকে “ঈশ্বরের করুণায় ও জাতির ইচ্ছানুসারে ফরাসী জাতির রাজা”-এই উপাধি দেওয়া হয়। রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাষ্ট্রয়ত্ত করে তাঁর ব্যক্তিগত খরচের জন্য বার্ষিক ভাতা ২৫ মিলিয়ন লিভ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।

১৭৯১ সালের নতুন সংবিধানে: শাসনবিভাগের দায়িত্ব রাজার হাতে অর্পন করা হয়। রাজা ছয় জন মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের নিয়োগের অধিকার লাভ করেন। (বর্তমানে ভারতীয় সংবিধান বলে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক তথা রাষ্ট্রপতি সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তাদের নিয়োগ করে থাকেন অর্থাৎ ভারতীয় সংবিধানের প্রায় ১৬০ পূর্বে ফ্রান্স এই পদক্ষেপ নিয়েছিল)। তবে মন্ত্রীসভার সদস্যরা আইন সভার সদস্য হতে পারবেন না। রাজা আইনসভার অধিবেশন স্থগিত রাখতে বা বাতিল করতে পারবেন না।

তবে কোন আইনকে তিনি ‘সাময়িক নাকচ ক্ষমতা’ (Suspensive Veto) দ্বারা স্থগিত রাখতে পারবেন। তবে অর্থবিল ছাড়া যে-কোন আইনের বিরুদ্ধে রাজা সর্বাধিক দু’বার স্থগিতাদেশ প্রয়োগ করতে পারবেন। আইনটি আইনসভায় তৃতীয়বার গৃহীত হলে রাজার অনুমোদন না থাকলেও তা বৈধ বলে গণ্য হবে। (উপরের সমস্ত নিয়মগুলি আমাদের বর্তমান সংবিধানে অনেকটাই প্রযোজ্য রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গুলি ফ্রান্স অনেক আগেই নিয়ে ফেলেছিল)

নতুন সংবিধান বলে ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল ‘এক-কক্ষযুক্ত’ আইনসভা। আইনসভার সদস্য হবেন ৭৪৫ জন। এঁরা নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক দু’বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। কর প্রস্তাব ও আইন প্রণয়নের ব্যাপারে আইনসভার ক্ষমতা ছিল চূড়ান্ত। যুদ্ধঘোষণা বা শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রেও আইনসভার অনুমোদন ছিল আবশ্যিক।

নতুন সংবিধান বলে সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্টে বিভক্ত করা হয়। সেগুলিকে আবার জেলা, ক্যান্টন ও কমিউনে ভাগ করা হয়। (অর্থাৎ আমাদের সংবিধান বলে আমরা যে-ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানি বা পড়ি তা ১৬০ বছর পূর্বে ফ্রান্সে প্রচলন করা হয়েছিল।) প্রতিটি শাসনবিভাগের দায়িত্ব নির্বাচিত কমিটির হাতে ন্যস্ত থাকে। অর্থাৎ প্রচলিত কেন্দ্রের মনোনয়ন প্রথা বাতিল হয়ে যায়।

‘ইনটেনড্যান্ট’ পদের বিলোপ ঘটে। প্যারিসের পৌরসভাকে ঢেলে সাজানো হয়। পৌরপ্রশাসনকে ৪৮টি সেকশনে বিভক্ত করা হয়। পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব স্থানীয় ইউনিটগুলির হাতে অর্পিত হয়। (আজকে বিভিন্ন পুলিশ থানা ও মহকুমা আদালত, জেলা আদালত-এর ধারণা ১৭৯১ সালের ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী আমাদের গণপরিষদ তৈরি করেছিল) কেন্দ্রের মত স্থানীয় প্রশাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কেবল সক্রিয় নাগরিকরা ভোটাধিকার পান। তবে এই সংবিধান নারীদের ভোটাধিকার নিয়ে নিশ্চুপ ছিল।

১৭৯১ সালের নতুন সংবিধান বলে বিচারবিভাগের গণতন্ত্রীকরণ করা হয়। পার্লম-এর কর্তৃত্ব বা ‘লেত্রি-দ্য-ক্যাশে’ আইনের অবসান ঘটে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকার মত ফ্রান্সের বিচারবিভাগকে প্রশাসন থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বলে ঘোষণা করা হয়। আইনের দৃষ্টিতে সবার সমানাধিকার ঘোষিত হয়। প্রদেশ, জেলা ও পৌর স্তরে আদালত স্থাপন করার সিদ্ধান্ত হয়। সর্বোচ্চে স্তরে থাকে আপীল আদালত ও উচ্চ আদালত (High Court)। বিচারকরা সক্রিয় নাগরিকের ভোট দ্বারা নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্ত হবেন বলে স্থির হয়। উচ্চ আদালত মন্ত্রীদের বিচারের অধিকার লাভ করে।

১৭৯১ সালের নতুন সংবিধান বলে সম্পত্তির ভিত্তিতে ফ্রান্সের নাগরিকদের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল তবে কেবল সক্রিয় নাগরিকরা ভোটাধিকার লাভ করেছিল। ভোটাধিকারেরও দুটি স্তর ছিল। ফ্রান্সে বসবাসকারী ২৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের যেসব পুরুষ তিনদিনের অদক্ষ শ্রম-কর হিসেবে রাষ্ট্রকে দিতে সক্ষম, তারা প্রাথমিক পর্বে ভোটাধিকার পান। এদের ভোটে নির্বাচিত ব্যাক্তিরা আইনসভার সদস্য বা ‘ডেপুটি’ পদে নির্বাচিত হবেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে ভোটাধিকার পাবার ক্ষেত্রে আর্থিক মান আর একটু বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ভোটদাতাকে অন্ততঃ দশদিনের মজুরি কর হিসেবে রাষ্ট্রকে প্রদান করতে হত। ‘ডেপুটি’ পদে নির্বচনের যোগ্যতার জন্য পদ-প্রার্থীকে একটি রৌপ্য মুদ্রা (৫৪ ফ্রাঙ্ক) বা ৫২ লিভ্র কর হিসেবে প্রদানের ক্ষমতা অর্জন করতে হত। অর্থাৎ ভোটদাতা ও নির্বাচন-প্রার্থী উভয়ক্ষেত্রেই আর্থিক ক্ষমতার বেড়াজাল টানা হয়। এই ব্যবস্থায় ১৭৯১-এর নির্বাচনে ফ্রান্সের প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ‘সক্রিয়’ নাগরিক বলে চিহ্নিত হন মাত্র ৪ লক্ষ মানুষ। এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের ভোটাধিকার পান মাত্র ৫০ হাজার পুরুষ।

১৭৯১ সালের সংবিধান বলে অর্থ ব্যবস্থার অমূল সংস্কার করা হয়েছিল। ১৭৭৯ সালের কৃষক বিপ্লবের সময় প্রচলিত কর যেমন-টাইদ, ক্যাপিটেশন, ভিংটিয়েম প্রভৃতি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো নতুন আয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে রাজকোষের অবস্থা খুবই করুণ হয়ে পড়েছিল। এই সময় আর্থিক সংকট কাটানোর জন্য ‘এ্যাসাইনেট'(assignat) নামে একটি কাগজের মুদ্রা চালু করা হয়েছিল। যদিও কাগজি মুদ্রার অনিয়ন্ত্রিত প্রচলন ফ্রান্সকে মুদ্রাস্ফিতির কবলে নিক্ষিপ্ত করেছিল। সংবিধান সভা আয়ের পথ উদ্ভবনের জন্য সমস্ত প্রকার জমির ওপর ভূমি-কর আরোপ করা হয়েছিল। ব্যক্তিগত আয়, শিল্প ও বাণিজ্যজাত আয়ের ওপরেও কর বসানো হয়েছিল। চার্চের সমস্ত ভূ-সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল। এবং তা বিক্রি করে রাজকোষকে স্ফীত করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। এতেও রাজকোষের দুর্বলতা কাটানো সম্ভব হয়নি।

১৭৯১ সালের সংবিধান বলে চার্চ ও যাজক সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলি ছিল বেশ জটিল ও বিতর্কিত। বিদ্রোহের শুরুতেই রোমান ক্যাথলিক চার্চ তার স্বাধীনতা অনেকটা হারিয়েছিল। টাইদ বা ধর্মকর আদায় বন্ধ হয়েছিল। চার্চের ভূ-সম্পত্তি রাষ্ট্রয়ত্ত হয়েছিল। অতঃপর সংবিধানসভা ‘সিডিল কনস্টিটিউশন অব দি ক্লাজি’ (Civil Coustitution of the clergy) নামন দলিল প্রকাশ করে (২৪শে আগস্ট, ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে) চার্চকে আরো ক্ষমতাহীন করে দেয়। সংবিধানসভার যাজক প্রতিনিধিরা আপত্তি সত্ত্বেও এই দলিলটিকে মেনে নেন। এই বিধান দ্বারা বিশপ শাসিত ১৩৫টি অঞ্চলকে পুনর্বিন্যস্ত করে ৮৩ ডিপার্টমেন্টের অনুরূপ করা হয়। বিশপ ও যাজকরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হবেন বলে স্থির হয়। তাঁরা রাষ্ট্রের অধীনে বেতনভোগী কর্মীতে পরিণত হন। ফলে পোপ পূর্বেকার অনুমোদন ক্ষমতা হারান।

6)ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষে আইফেল টাওয়ার

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে যে ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল তাঁর শতবর্ষে ১৮৮৯ সালে প্যারিস শহরে তৈরি হয়েছিল আইফেল টাওয়ার। এই টাওয়ারের ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী ছিলেন গুস্তাভ আইফেল। বলাবাহুল্য আইফেলের নামেই টাওয়ারের নাম হয়েছে আইফেল টাওয়ার। এই টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৮৮৭ সালের ২৮ জানুয়ারি। দু’বছর কাজ চলার পর ১৮৮৯ সালের ৩১ মার্চ এই টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তৎকালীন বিশ্ব মেলায় আগত সকলের জন্য এই টাওয়ার খুলে দেওয়া হয় ১৮৮৯ সালের ১৫ মে।

আইফেল টাওয়ারে যে প্রকারের আইরন ব্যবহার করা হয়েছে, সেই একই প্রকারের আইরন ভারতের একমাত্র স্থাপত্য ‘দি তাজ প্যালেস অফ মুম্বাই’-এর মধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এই টাওয়ার নির্মাণের পূর্বে ওয়াশিংটন মনুমেন্ট (১৮৪৮-১৮৫৪ সাল পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছিল) ছিল সবচেয়ে লম্বা। ওয়াশিংটন মনুমেন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটন এর স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছিল। ওয়াশিংটন ছিলেন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কন্টিনেন্টাল আর্মির বিজয়ী কমান্ডার-ইন-চিফ। তিনি ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

১৮৮৯ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আইফেল টাওয়ার ছিল বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা। ১৯৩০ সালের ২৭ মে নির্মান কাজ শুরু হয় ক্রাইসলার বিল্ডিং (আমেরিকার নিউ ইয়র্ক)-এর। ১৯৩১ সালের ১ মে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ক্রাইসলার বিল্ডিং-ই বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম লম্বা ভবন।

প্যারিসের স্থানীয় মানুষ আইফেল টাওয়ার-কে ‘লা ডেম দে ফের’ বা ফরাসি ভাষায় ‘আয়রন লেডি’ বলে ডাকে। এই টাওয়ারটি বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়াল্ড হেরিটেজ তকমা পেয়েছে। এই টাওয়ারটি ১০৮৩ ফুট লম্বা যা ৮১ তলা ভবনের সমান উচ্চতা। বর্তমানে আইফেল টাওয়ারটিতে দর্শনার্থীদের জন্য তিনটি স্তর রয়েছে। তৃতীয় স্তরটি গুস্তাভ আইফেলের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছিল। তৃতীয় স্তরে আইফেল তার বন্ধু টমাস আলফা এডিসন কে আমন্ত্রণ করেছিল। আইফেল টাওয়ারের নকশা করেছিলেন দুই ইঞ্জিনিয়ার।

তাঁরা হলেন মরিস কোয়েচলিন এবং এমাইল নুগুয়ের। তাঁরা ডেস ইটাব্লিসেমেন্টস কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আইফেল টাওয়ারের নকশা পাশ হয়েছিল ১৮৮৫ সালের ৩০ মার্চ। এই টাওয়ার নির্মাণের জন্য ফ্রান্সের বাণিজ্য মন্ত্রী এডুয়ার্ড লকরয় এবং ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুলেস গ্রেভি বাজেট পেস করেছিলেন। এই সময় ন্যাশন্যাল ব্যাঙ্ক অফ হাইতি কিছু ঋণ দিয়েছিল এই টাওয়ার নির্মাণের জন্য। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এই টাওয়ারকে ফরাসি স্বাধীনতার একটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে বিশ্বের অন্যতম ল্যান্ডমার্ক বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গুস্তাভ আইফেল তার টাওয়ারটিকে মিশরীয় পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

কয়েকটি ইউরোপের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ (SOME EUROPEAN HISTORICAL INCIDENT) (1689-1930)

Leave a Reply