ওয়েস্ট ফেলিয়ার শান্তি চুক্তি ছিল ১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত চলা ত্রিশ বছরের যুদ্ধ এবং ১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত চলা অক্টেন বার্ষিক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে জার্মানির ওয়েস্টফেলিয়া অঞ্চলে স্বাক্ষরিত দুটি শান্তি চুক্তি। এটি ইউরোপের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল, যা আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।
Table of Contents
ওয়েস্ট ফেলিয়ার শান্তি চুক্তি কিভাবে ইউরোপে একটি নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিলেন।
• ভূমিকা:-
বোহেমিয়ার একটি আঞ্চলিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে ত্রিশ বছরের এই যুদ্ধের শুরু হলেও এই যুদ্ধ অনতিবিলম্বে সমগ্র জার্মানীতে বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামে পরিণত হয়। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট ও জার্মানীর রাজন্যবর্গ ছাড়াও মধ্য, পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের অধিকাংশ দেশই এই যুদ্ধে কোনো না কোনো পক্ষে যোগদান করে। শেষ পর্যন্ত ১৬৪৮ খ্রিঃ ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তি অনুসারে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে।
এই শান্তিচুক্তি জার্মানীর ধর্মসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস সংস্থাপন করে, যার ফলে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সময় হ্যাপসবুর্গ পরিবারের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং ফ্রান্সের অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত হয়। ধর্মীয় সংঘর্ষ হিসাবে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ শুরু হলেও এই যুদ্ধের সমাপ্তির পর ওয়েস্টফেলিয়ার চুক্তি দ্বারা সম্পাদিত বন্দোবস্ত ছিল প্রধানত রাজনৈতিক। তবে ওয়েস্টফেলিয়ার চুক্তিকে নিঃসন্দেহে ইউরোপের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী ঘটনা বলা যেতে পারে। এই যুদ্ধে ইউরোপের ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের জন্য বিভিন্ন রাজপরিবারের মধ্যে তীব্র সংগ্রামের সূচনা হয়।
• ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি-চুক্তির ফলাফল:-
প্রথমত:-
ধর্মীয় বন্দোবস্তের দিক থেকে বিচার করলে ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধের ফলাফল ছিল অমীমাংসিত এবং প্রায় গুরুত্বহীন। দক্ষিণ ও পশ্চিম জার্মানী পূর্বের মতোই ক্যাথলিক মতাবলম্বী থেকে যায়। আর উত্তর জার্মানী প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ অক্ষুন্ন রাখতে সমর্থ হয়। চার্চের সম্পত্তিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের একটি নতুন সূত্র উদ্ভাবন করা হয়। এছাড়া ক্যালভিনের মতবাদকে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম ধর্মমত হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত:-
ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল ইউরোপের মানচিত্র নতুন করে বিন্যাস করা। মেৎজ, তৌল এবং ভার্টুন -এই তিনটি বিশপিকের উপর ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের দাবি এই চুক্তির দ্বারা স্বীকৃতি লাভ করে। এছাড়া সম্রাটের অধীনস্থ স্ট্রাসবার্গ শহর এবং তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলা বাদে আলসাস প্রদেশের অন্যান্য স্থানগুলি ফ্রান্সের হাতে সমর্পণ করা হয়। এই সব অঞ্চলগুলি পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফ্রান্সের হাতে স্থায়ীভাবে অর্পণ করা হয়। রাইননদীর উপর কর্তৃত্ব নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানীর মধ্যে বিবাদের সূচনা হয়।
তৃতীয়ত:-
সুইডেন পোমারেনিয়ার পশ্চিমদিকের অর্ধাংশ লাভ করে এবং ব্রিমেন ও ভার্দেন -এর বিশপ্রিক দুটি তার হস্তগত হয়। এই সব অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব লাভকরার ফলে জার্মানীর ওয়েৎজার, এলব এব ওডার -এই তিনটি নদীর মোহনা অঞ্চল সুইডেনের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সুইডেন জার্মান ডীট-এর সদস্যপদ লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে ওয়েস্ট–ফেলিয়ার চুক্তি ইউরোপের উপর সুইডেনের প্রভাবের চরম পরিচয় বহন করে। এবং বাল্টিক অঞ্চলে সুইডেনের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
চতুর্থত:-
সুইজারল্যান্ড এবং ওলন্দাজ বাসভূমি নেদারল্যান্ড ওয়েস্টফেলিয়ার চুক্তির সময় পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন রাজ্যরূপে স্বীকৃতি লাভ করে।
পঞ্চমত:-
ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধের ফলে পবিত্র রোমান সম্রাটের রাজনৈতিক অধিকার অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। সম্রাটের অনুমতি এবং অনুমোদন ছাড়াই পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত রাজ্যগুলি অন্য যে কোনো রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি সম্পাদন এবং মিত্রতাস্থাপনের অধিকার লাভ করে। এর ফলে জার্মানী তিন শতের অধিক স্বাধীন রাজ্যের সার্বভৌম রাজ্যে পরিণত হয়ে পড়ে এবং এইসব রাজ্যের শাসকগণ নিজেদের বিচারালায় ও সৈন্যবাহিনী গঠন করার এবং আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা লাভ করে। এর ফলে জার্মানী সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে এবং যে সামান্য রাজনৈতিক ও জাতীয় ঐক্য জার্মানীতে ইতিপূর্বে অবশিষ্ট ছিল তাহাও ধূৎস হয়ে যায়।
ষষ্ঠত:-
ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ফলে জার্মানী কেবলমাত্র রাজনৈতিক দিক থেকেই বিশ্বস্ত হয়নি, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ব্যাপারেও তার যথেষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি হয়। জার্মানীর জনসংখ্যা প্রচুর পরিমাণে হ্রাস পায় -জার্মানীর এক-তৃতীয়াংশ লোক যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বহু সমৃদ্ধ নগরী ধৃৎসস্তূপে পরিণত হয়। শস্য-শ্যামলা কৃষিক্ষেত্রগুলি পতিত ও বনজঙ্গলে পূর্ণ শিকারী জীবজন্তুর আবাসস্থলে পরিণত হয়। শিল্প ও বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে ধুৎস হয় এবং নৈতিক, সাংস্কৃতিক জগতে এক সুদীর্ঘ বন্ধ্যাযুগের সৃষ্টি হয়।
সপ্তমত:-
আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নের পথ এই যুদ্ধ প্রশস্ত করে তোলে। আন্তর্জাতিক আইনের অর্থই হল রাজনৈতিক মর্যাদায় তাত্ত্বিকভাবে সমান মর্যাদাসম্পন্ন বহুসংখ্যক সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি স্বীকৃতি দান। কিন্তু ইউরোপের দুটি প্রতিষ্ঠান ছিল এরূপ আদর্শ উদ্ভবের পথে প্রধান বাধা। এদের একটি ছিল আন্তর্জাতিক সংগঠনসহ ক্যাথলিক চার্চ এবং এর পক্ষ থেকে সর্বজনীন ধর্মসংক্রান্ত প্রাধান্য দাবি করত। অপরটি ছিল ইউরোপের ঐতিহাসিক ব্যাপারে প্রাধান্যের দাবিদার পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য এবং এই সাম্রাজ্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে নিজের সমতা স্বীকার করতে কখনোই প্রস্তুত ছিল না।
• মূল্যায়ন বা গুরুত্ব:-
১৬৪৮ খ্রিঃ ওয়েস্ট ফেলিয়ার শান্তিচুক্তিকে যুগসন্ধিক্ষণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে অভিহিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ ধর্মীয় যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক আগ্রাসন যুগের মধ্যে বিভাজক রেখা হিসাবে ওয়েস্ট ফেলিয়ার চুক্তিকে চিহ্নিত করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমদিকে ধর্মীয় বিরোধ বিভিন্ন জাতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা অপেক্ষা অধিকতর গুরুত্ব লাভ করে। কিন্তু শোড়শ শতকের মধ্যভাগ থেকেই তাহা বিভিন্ন রাজবংশের পক্ষ থেকে প্রাধান্য স্থাপনের এবং উপনিবেশ সম্প্রসারণের বিরোধে পরিণত হয়। এই যুগসন্ধিক্ষণের বৈশিষ্ট্য ত্রিশ বছর ব্যাপী যুদ্ধের মধ্যে বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়, -ধর্মীয় যুদ্ধরূপে এর সূচনা হলেও রাজবংশসমূহের সংঘর্ষরূপে এর পরিসমাপ্তি ঘটে।