আঞ্চলিক উপজাতীয় ফোল্ক উৎসব

আঞ্চলিক উপজাতীয় ফোল্ক উৎসব – বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত হওয়া উপজাতীয় লোক উৎসবগুলি হলো ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক চমৎকার প্রতিফলন। এই উৎসবগুলির মাধ্যমে উপজাতিরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, লোকনৃত্য, সঙ্গীত এবং জীবনধারাকে তুলে ধরে।

READ MORE – মাধ্যমিক HISTORY SUGGESTION 2025

আঞ্চলিক উপজাতীয় ফোল্ক উৎসবের পরিচয় দাও।


উঃ  আঞ্চলিক উপজাতিদের অনেক উৎসব রয়েছে, যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈসাবি (চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, এবং ত্রিপুরার বৈসুক)। এছাড়া, সাঁওতালদের সহরায় উৎসব, ওরাওঁ ও মুন্ডাদের সারহুল এবং অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন উপজাতির উৎসব, যেমন সোলুং, মোপিন, ও নিয়োকুম উল্লেখযোগ্য। এই উৎসবগুলো সাধারণত কৃষি, নববর্ষ, বা ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। 

প্রধান আঞ্চলিক উপজাতি উৎসবসমূহ:

১)বৈসাবি: 

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান তিনটি উপজাতির বর্ষ বরণ উৎসব। বৈসাবি হলো বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিনটি প্রধান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব। এটি ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিজু’—এই তিনটি উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত। এই উৎসব মূলত বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় এবং বছরের শেষ ও নতুন বছরের প্রথম দিন মিলে তিন দিন ধরে এটি পালন করা হয়। 
বৈসাবি উৎসবের মূল দিক

নামকরণের উৎপত্তি: 

বৈসাবি নামটি এসেছে তিনটি ভিন্ন উৎসবের নাম থেকে—বৈসু (ত্রিপুরা), সাংগ্রাই (মারমা), এবং বিজু (চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা)।

সময়কাল: 

সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন—এই তিন দিনব্যাপী উৎসবটি পালিত হয়।

উদযাপনের উদ্দেশ্য: 

পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়, যা নতুন আশা ও নতুন শুরুর প্রতীক।

প্রধান অঞ্চল: 

পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় এই উৎসব বিশেষভাবে পালিত হয়।

বৈশিষ্ট্য:

 এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী ও আনন্দময় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। 

২) চাকমা:

 বিজু  ঃ চাকমাদের বিজু উৎসব বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নববর্ষের প্রথম দিন পালিত হয় এবং এটি একটি তিন দিনব্যাপী উৎসব। এই উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ফুল বিজু’, যেখানে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করা হয়। দ্বিতীয় দিন ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ বা ‘মূল বিজু’ এবং তৃতীয় দিন নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। 

প্রথম দিন:

ফুল বিজু:

এই দিন সকালে সবাই মিলে ফুল সংগ্রহ করে নদী, ছড়া বা ঝরনায় ভাসায়, যা প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনার প্রতীক।

দ্বিতীয় দিন:

মূল বিজু:

এটি চৈত্র মাসের শেষ দিন এবং উৎসবের প্রধান দিন হিসেবে বিবেচিত হয়।

তৃতীয় দিন:

এটি বাংলা নববর্ষের দিন। এই দিনে সকলে মিলে একসাথে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়।


বিজু নৃত্য:

এই উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হল বিজু নৃত্য, যা একটি বর্ণাঢ্য উৎসবের অংশ। 

৩) মারমা: 

সাংগ্রাই ঃ- সাংগ্রাই হল মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব, যা প্রতি বছর এপ্রিল মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত উদযাপিত হয়। এই উৎসবটি তাদের বর্মী বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে পালিত হয় এবং ‘জলকেলি’ বা ‘মৈতা রিলং পোয়ে’ (পানিবর্ষণ উৎসব) এর মাধ্যমে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। 

সাংগ্রাই উৎসবের মূল বিষয়গুলো:

সময়: 

প্রতি বছর এপ্রিলের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত।

উদ্দেশ্য: 

পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানো।

প্রধান আকর্ষণ:

 ‘মৈতা রিলং পোয়ে’ বা পানিবর্ষণ উৎসব, যেখানে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের দিকে পানি ছিটিয়ে আনন্দ করে এবং মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

অন্যান্য উৎসব:

 এটি ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’ এবং চাকমাদের ‘বিজু’ উৎসবের সাথে ‘বৈসাবি’ উৎসবের অংশ।

অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: 

এই উৎসবের অংশ হিসেবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, বয়োজ্যেষ্ঠ পূজা ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। 

৪) ত্রিপুরা: 

বৈসুক, বৈসু বা বাইসু ঃ- ত্রিপুরার বৈসুক উৎসব হলো ত্রিপুরীদের নববর্ষ উদযাপন, যা চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন, মোট তিন দিন ধরে পালিত হয়। এই উৎসবে আগামী দিনের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয়। উৎসবের তিন দিনকে যথাক্রমে হারি বৈসু, বৈসুমা এবং বিসি কাতাল বলা হয়। 

উৎসবের সময়:

 চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন।

উৎসবের উদ্দেশ্য: 

আগামী দিনের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা।

তিন দিনের নাম:

হারি বৈসু: প্রথম দিন। বৈসুমা: দ্বিতীয় দিন। বিসি কাতাল: তৃতীয় ও শেষ দিন।

উদযাপন: 

এই দিনে তারা ফুল, ধূপ ও দ্বীপ জ্বালিয়ে নদী বা পবিত্র স্থানে ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে, পুরানো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। পশুকেও সম্মান জানানো হয়, তাদের শিং ও গলায় ফুলের মালা পরানো হয়। 

৫)সহরায়: 

সাঁওতালদের একটি প্রধান উৎসব। সহরায় সাঁওতালদের একটি প্রধান উৎসব, যা ফসল কাটার পর কার্তিক বা পৌষ মাসে পালিত হয় এবং এটি মূলত গৃহপালিত পশুর মঙ্গল ও ধনসম্পত্তি বৃদ্ধির জন্য করা হয়। এই উৎসবে বোঙ্গাদের (দেবতা) কাছে প্রার্থনা করা হয় এবং অনেক সময় এটি দিওয়ালির সাথে মিলে যায়। উৎসবটি ‘হাতি লেকান সহরায়’ নামেও পরিচিত, কারণ এটি পাঁচ দিন পাঁচ রাত ধরে চলে। 
সহরায় উৎসব সম্পর্কে আরও তথ্য


নামের উৎস: ‘শাহার’ শব্দ থেকে ‘সহরায়’ বা ‘সোহরাই’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া।


পালনের উদ্দেশ্য: মানুষ এবং গৃহপালিত পশুর মঙ্গল কামনা করা এবং ফসল ও ধনসম্পত্তির বৃদ্ধি ও প্রাচুর্য লাভের জন্য বোঙ্গাদের (দেবতা) কাছে প্রার্থনা করা।


সময়: এটি সাধারণত কার্তিক মাসে পালিত হয়, তবে অর্থনৈতিক কারণ বা স্থানভেদে পৌষ মাসেও অনুষ্ঠিত হয়।


সময়কাল: উৎসবটি পাঁচ দিন পাঁচ রাত ধরে চলে, তাই একে ‘হাতি লেকান সহরায়’ বলা হয়।


প্রস্তুতি: উৎসবের আগে গ্রামবাসীরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে এবং নারীরা দেয়াল সোহরাই শিল্প দিয়ে সাজান।


নেতৃত্ব: গ্রামের পুরুষরা গোত্র প্রধান বা ‘মাঝি’-র (নায়েক) নেতৃত্বে উৎসবের দিন নির্ধারণ করে।


অন্যান্য ধর্মীয় অংশ: উৎসবের প্রথম দিন (উম হিলোক) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিন এবং দ্বিতীয় দিন (বনগান হিলোক) বিদেহী আত্মার স্মরণে বাড়িতে সময় কাটানো হয়। 

৬)সারহুল: 

ওরাওঁ এবং মুন্ডাদের একটি উৎসব যা বসন্তের শুরু এবং ফসল রোপণের সময় পালন করা হয়। সারহুল একটি বসন্ত উৎসব যা মূলত ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়, যেমন ওরাওঁ, মুন্ডা এবং হো উপজাতিরা পালন করে। এই উৎসবের আক্ষরিক অর্থ হলো “শাল গাছের পূজা”, যা প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং নতুন বছরের সূচনাকে চিহ্নিত করে। এই উৎসবে গ্রামের পুরোহিত প্রকৃতির দেবতা এবং পূর্বপুরুষদের পূজা করেন এবং এই পূজা কৃষিকাজ শুরুর প্রতীকও বটে। 


উৎসবের মূল দিকগুলো:


প্রকৃতির পূজা: – সারহুল হলো একটি প্রকৃতি-ভিত্তিক উৎসব যেখানে শাল গাছের উপাসনা করা হয়, কারণ এটিকে গ্রাম দেবতার আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। 


সময়:  এটি সাধারণত চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ৩য় দিন থেকে চৈত্র পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন দিন ধরে পালিত হয়। 


পূজা: – গ্রামের পুরোহিত, যিনি ‘পাহান’ নামে পরিচিত, তিনি সৌভাগ্যের জন্য সূর্য, গ্রাম দেবতা এবং পূর্বপুরুষদের ফুল, ফল, সিঁদুর, মোরগ এবং ‘তপন’ (এক ধরনের মদ) উৎসর্গ করেন। 


গুরুত্ব: – এই উৎসবের পর আদিবাসী সম্প্রদায় কৃষিকাজ শুরু করে, যা প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে গভীর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। 


সাংস্কৃতিক তাৎপর্য:  এটি ওরাওঁ, মুন্ডা, সাঁওতাল, খাদিয়া এবং হো উপজাতিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব, যা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। 


অরুণাচল প্রদেশের উৎসব: বিভিন্ন উপজাতি তাদের জীবনধারা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়ে অনেক উৎসব পালন করে। এদের মধ্যে রয়েছে সোলুং, মোপিন, নিয়োকুম, লোসার, সানকেন, ইত্যাদি।

৭) জাওয়া করম: 

শস্যবীজ সংক্রান্ত একটি উৎসব। জাওয়া-করম উৎসব হলো একটি কৃষিভিত্তিক উৎসব, যা প্রধানত ভাদ্র মাসের শুক্ল একাদশীতে পালিত হয়। এটি করম দেবতার উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যিনি শক্তি ও যৌবনের প্রতীক। এই উৎসবে, বিশেষ করে আদিবাসী ও কুড়মি সম্প্রদায়ের নারীরা ভালো শস্য উৎপাদন ও সমৃদ্ধির কামনায় উপবাস রাখেন, নাচ-গান করেন এবং ‘জাওয়া’ নামক শস্যের অঙ্কুরিত চারা পুজো করেন। 


প্রধান বৈশিষ্ট্য


সময়: ভাদ্র মাসের শুক্ল একাদশী তিথিতে মূল উৎসবটি পালিত হয়, তবে এর প্রস্তুতি কয়েক দিন আগে থেকেই শুরু হয়।


পূজা: এই উৎসবে করম দেবতার উপাসনা করা হয়। এর সঙ্গে করম গাছের ডাল ও প্রাকৃতিক উপাদানের পূজা অন্তর্ভুক্ত।


জাওয়া: মেয়েরা উপবাস থেকে ‘জাওয়া’ তৈরি করে। এর জন্য তারা ছোট টুপা বা ডালায় বালি ভর্তি করে এবং তাতে মটর, মুগ, বুট ইত্যাদি বীজ মাখিয়ে রাখে।


পালন: এই উৎসবটি মূলত ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ (বিশেষত জঙ্গলমহল), বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা এবং আসামের মতো রাজ্যগুলিতে পালিত হয়।


উদযাপন: উৎসবের সময় গান ও নাচের মাধ্যমে আনন্দ করা হয়। জঙ্গল থেকে কাঠ, ফল ও ফুল সংগ্রহ করে করম দেবতার পুজো করা হয়। 

অন্যান্য উৎসব:


কারাম: একটি উপজাতি উৎসব।


নাগা উৎসব: নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন নাগা সম্প্রদায়ের উৎসব।


ভিল সম্প্রদায়: গাওয়ারী উৎসব, যা হোলির পর উদযাপিত হয়। 

আঞ্চলিক উপজাতীয় ফোল্ক উৎসব
 

Leave a Reply