উনিশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রকৃতি ও তাৎপর্য – উনিশ শতকের ভারতীয় সমাজ সংস্কার আন্দোলন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যা ভারতীয় সমাজের প্রথাগত ধ্যানধারণা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক নবজাগরণ নিয়ে আসে। এই আন্দোলন কেবল ধর্মীয় বা সামাজিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ভারতীয়দের মধ্যে যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং আধুনিক চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছিল।
Table of Contents
ধর্ম ও সামাজিক সংস্কারে রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান
উনিশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রকৃতি ও তাৎপর্য

সমাজ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সামাজিক সংস্কার। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের দ্বন্দ্বে এই সংস্কার আন্দোলনগুলি অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যযুগে ভক্তি আন্দোলনের সময় সংস্কারের যে ধারা ভারতবর্ষে প্রবাহিত হয় আধুনিক ভারতে তেমনই সক্রিয় সামাজিক সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল, যা ‘রেনেসাঁস’-এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সংযুক্ত হয়।
এই আন্দোলন ইউরোপের আলোকময় যুগের পরবর্তীকালের যুক্তিবাদী ও উদারপন্থী মানবতার আদর্শের সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত না হলেও, মৌলিক কতকগুলি নীতির দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। নব-উদ্ভাবিত মুদ্রণ-সংস্কৃতির সাহায্যে প্রচলিত সামাজিক কাঠামোকে অটুট রেখে দেশীয় ঐতিহ্যগত আচার-বিধির পুনর্মূল্যায়ন করতে এই আন্দোলনের সংস্কার কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। এদের কোনোরূপ বৈপ্লবিক ঔদ্ধত্য ছিল না। বরং সহনশীলতা ও সংবেদনশীল আবেদন ছিল।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রথমদিকে ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ রীতিনীতিতে কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। বরং ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় সনাতন ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে যথেষ্ট সম্মান জানানো হয়েছিল। তাঁর পরবর্তীকালে ভারতীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে বিদেশী শক্তি অতি সন্তর্পণে সাবধানী পদক্ষেপে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। ব্রিটেনের কতকগুলি মতবাদ যেমন ইভানজেলিকলিজম্, অবাধ বাণিজ্যনীতি প্রভৃতির প্রভাবে এই প্রবণতা দেখা যায়। ইউটিলিটারিয়ান মতবাদীরা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত ক্ষমতা আহরণের যুক্তি দিলেন, অপরদিকে ইভানজেলিস্টরা পুরোহিততন্ত্রের আধিপত্য থেকে ভারতীয়দের মুক্তির জন্য সরকারী হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার প্রতি অঙ্গুলি-নির্দেশ করলেন।
যাইহোক, দেশীয় উদ্যোগ শুরু হবার আগেই কিন্তু ঔপনিবেশিক ভারতে সমাজ সংস্কারের কাজ শুরু হয়। এটি সম্ভব হয় খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রবল চাপে। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ১৮০২ সালে রেগুলেশন ৪ মোতাবেক বাংলা উড়িষ্যা ও বেনারসে শিশুহত্যা বন্ধ করার জন্য আইন জারী করা হয়। বাংলার সমাজের কোনো গোষ্ঠীই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেনি। সম্ভবত এই প্রথা হিন্দু শাস্ত্রীয় অনুশাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না।
তবে ব্রিটেনের সেবামূলক সংস্থাগুলিকে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হত। প্রগতিশীল সাংসদদের মতামত উপেক্ষা না করলেও উপর থেকে চাপানো সংস্কারসূচী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র কাগজে কলমেই স্থান পেত কারণ তৃণমূল স্তর থেকে আধুনিক সমাজ সচেতনতার উন্মেষ ঘটানোর কোনো প্রয়াস তখনও হয়নি। সাগর দ্বীপে শিশু বিসর্জনের প্রথা বন্ধ করা হলেও কন্যা হত্যার মত নিষ্ঠুর সামাজিক প্রথাকে রোধ করা যায়নি। বিশেষত পশ্চিম ও উত্তর ভারতে উচ্চবর্ণজ জমিদার পরিবারগুলি উচ্চবর্ণে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করতেন।
দাসত্ব-প্রথা হল আরেকটি সামাজিক অভিশাপ। মিশনারীরা দাস-বাণিজ্যকে মেনে নিয়েছিলেন। ইংলন্ডে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে যে গণ-অবস্থান হয় ভারতে তার প্রভাব এসে পড়ে। ১৮১১ সালের রেগুলেশন ১০ (X) ধারায় দাস-চালানের প্রথা নিয়ন্ত্রিত হয়। ১৮৪৩ সালের একটি আইন (Act V) অনুসারে দাসত্ব-প্রথা ও দাস-বাণিজ্যকে নিষিদ্ধ করা হয়। শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, শতাধিক প্রাচীন দৈনন্দিন সংস্কৃতিতে প্রচলিত গৌণ সামাজিক প্রথাগুলির ক্ষেত্রে আইনী সংস্কার ফলপ্রসূ হয় না। দাসত্ব-প্রথা সেগুলির অন্যতম। বহুকাল ধরে জাতিভেদ, সামাজিক প্রথা, ঋণবন্ধতা প্রভৃতি বিভিন্নভাবে আবদ্ধ কৃষিশ্রমিক জমিদারের কাছে নিজেকে বন্ধক দেয়, যা আজও চলে আসছে।
ঠগ’দের অত্যাচার বন্ধ করার ক্ষেত্রেও আইনসভা আংশিকভাবে সফল হয়েছিল। দাক্ষিণাত্য মধ্যভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবার পর অমীমাংসিত অঞ্চলের বাস্তুহারা জনগণ ও আত্মরক্ষার জন্য জোটবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে। ভ্রাম্যমাণ সাধুর দল এই সমস্যা আরও বাড়ায়। এই ‘ঠগ’ সম্প্রদায় নিজেদের ‘Fraternity’-র সদস্য হিসাবে গণ্য করত যারা পরম্পরাগতভাবে ধর্মের নামে হত্যা এবং রাহাজানি, দস্যুবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করত। ১৮৩০ সাল নাগাদ ঠগদের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়। সরকার বাহাদুর দেশীয় সমাজ সংস্কার ও শিক্ষার মাধ্যমে ঠগের অত্যাচার বন্ধ করার চেষ্টা করেননি।
১৮৩৬ সালে ‘ঠগী’ আইন বলবৎ হবার পর ঠগী দপ্তর শুধু এই দলগুলির উপর সরকারী নজরদারি এবং ধর্মের নামে কোনো অপরাধ ঘটেছে কিনা তা পরিদর্শন করত। এই ঠগী সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান হয়নি। সামাজিক ও মননামা বনাম জন্য যে মিশনারী প্রচার ভাবনা-চিন্তা শুরু হয় তা ভারতীয় চিন্তাবিদ্গণকেও সংস্কারমুখী করে তোলে। ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ ধর্মীয় শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে দেখালেন বহু অমানবিক প্রথা সমাজে আবহমান চলে আসছে, ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরায় যার কোনো স্থান নেই। এই বিশ্লেষণ উইলিয়ম বেন্টিষ্কের মত কট্টর উপযোগিতাবাদে বিশ্বাসী মানুষকেও অত্যন্ত প্রভাবিত করেছিল।

উনবিংশ শতাব্দীর সংস্কার আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সমাজে নারীজাতির মনোন্নয়ন। সতীদাহ প্রথা অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর একই চিতায় তার বিধবা স্ত্রীকে আহুতি দেবার নির্মম প্রথাকে নিষিদ্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্কার। প্রগতিশীল ভারতীয় জনমতের সহায়তায় এবং শাস্ত্রের নির্বাচিত অধ্যায়ের পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে এই প্রথা বন্ধ করা হয়। প্রাচীন যুগ থেকে প্রচলিত এই প্রথা হিন্দু জীবনের একটি অমোঘ বিধান হিসাবে গণ্য করা হত। মোগল যুগে দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর রাজ্যে এবং মধ্যভারত ও রাজস্থানের শুধুমাত্র রাজপুত রাজপরিবারগুলির মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল। অষ্ঠাদশ শতকের শেষ এবং উনবিংশ শতকের প্রথমভাগে এই সতীদাহ প্রথা বিস্তার লাভ করে।
ব্রিটিশ আমলে কলকাতা ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে এই প্রথার ব্যাপক প্রচলন হয়। শুধুমাত্র উচ্চাবর্ণের পরিবার নয়, নিম্নবর্গীয় কৃষক পরিবারগুলিতেও সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবে সতীদাহ প্রথা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আদর্শ স্ত্রী জীবনে ও মরণে স্বামীর সহগমন করবে-এরূপ ধর্মবোধ এই প্রথাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। মূলত এই সতীদাহ প্রথার পশ্চাতে ছিল জ্ঞাতিকুটুম্বদের আর্থিক লালসা। লক্ষ্য করা যায়, সে সকল অঞ্চলে ‘দায়ভাগ’ ব্যবস্থা নামে হিন্দুধর্মস্বীকৃত সম্পত্তিবিধি প্রচলিত ছিল সেখানেই সতীদাহ প্রথা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
‘মিতাক্ষরা’ নামক অপর একটি প্রচলিত বিধির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় দায়ভাগ ব্যবস্থা বিধবা নারীকে তার মৃতস্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক উদার নীতি গ্রহণ করেছে। পুরোহিত শ্রেণির সঙ্গে যোগসাজসে সতীদাহের মত অপরাধ ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করে। মুসলমান, শিখ, মারাঠা প্রভৃতি মধ্যযুগীয় ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী সতীদাহ নিষিদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই, তবে সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী উদ্যোগ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগেই গ্রহণ করা হয়।
উনবিংশ শতকে (19th century) বাংলা তথা ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে যারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, এবং বিينy বেগম রোকেয়া উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ প্রচলন, নারী শিক্ষার প্রসার, জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা এবং কুসংস্কার দূরীকরণে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।সংস্কারকগণ হলেন:
• রাজা রামমোহন রায়:
ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি সতীদাহ প্রথা রদ করার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন এবং নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
• ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:
বাংলা সাহিত্যের একজন প্রভাবশালী লেখক এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি বিধবা বিবাহ আইন পাস করার জন্য সংগ্রাম করেন এবং নারী শিক্ষার প্রসারেও কাজ করেন।

• দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর:
ব্রাহ্ম সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, যিনি ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের জন্য কাজ করেন।
• কেশবচন্দ্র সেন:
ব্রাহ্ম সমাজের আর একজন প্রভাবশালী নেতা, যিনি নারী শিক্ষা ও সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
• বেগম রোকেয়া:
একজন বাঙালি লেখক এবং সমাজ সংস্কারক যিনি নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন এবং মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
• সৈয়দ আহমেদ খান:
মুসলিম সমাজে শিক্ষার প্রসারে এবং আধুনিকীকরণে কাজ করেছেন।
• দয়ানন্দ সরস্বতী:
আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি হিন্দু ধর্মের সংস্কারের জন্য কাজ করেছিলেন।
• অ্যানি বেসান্ত:
ব্রিটিশ সমাজকর্মী এবং থিওসফিস্ট যিনি ভারতে নারী অধিকার এবং শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
• সাবিত্রীবাঈ ফুলে:
তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম নারী শিক্ষক এবং নারী শিক্ষার অগ্রদূত।
• পণ্ডিতা রমাবাই:
একজন সমাজ সংস্কারক যিনি বিধবা বিবাহ এবং নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
• তারাবাই শিন্ডে:
তিনি ছিলেন একজন নারী অধিকার কর্মী যিনি নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন এবং নারী-পুরুষের সমতার জন্য আন্দোলন করেছেন।
• রমাবাই রানাদে:
তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক যিনি নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
• ফাতেমা শেখ:
তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষক এবং নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
• স্বর্ণকুমারী দেবী:
তিনি ছিলেন একজন লেখিকা এবং সমাজ সংস্কারক যিনি নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
• বোন নিবেদিতা:
তিনি ছিলেন একজন সমাজকর্মী যিনি নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
• কাদম্বিনী গাঙ্গুলী:
তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক এবং নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।
ঊনবিংশ শতকে ভারতীয় সমাজের নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম অধিকার ভোগ করতেন এবং তাদের জীবন মূলত গৃহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষা, সম্পত্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় তাদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও কুসংস্কার তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। ঊনবিংশ শতকে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই কম। কিছু উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা বাড়িতে শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া শিখত, কিন্তু সমাজের বৃহত্তর অংশের নারীরা ছিল নিরক্ষর। বাল্যবিবাহ ছিল একটি সাধারণ প্রথা। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হত এবং তাদের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠতে হত।

এই প্রথা অনুসারে, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবাকে স্বামীর চিতায় সহমৃতা হতে হত। যদিও এটি একটি কুপ্রথা ছিল, তবুও এটি ঊনবিংশ শতকে প্রচলিত ছিল। যৌতুক প্রথাও সমাজে প্রচলিত ছিল, যেখানে কন্যার পিতার কাছ থেকে অর্থ বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিস দাবি করা হত। এই প্রথায় নারীদের গৃহের অভ্যন্তরে আবদ্ধ রাখা হত এবং বাইরের জগৎ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হত।
সমাজে নারীদের ছিল পুরুষের তুলনায় অনেক নিচে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হত না এবং তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল সীমিত। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও কিছু নারী শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছিলেন এবং সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর প্রমুখ সমাজ সংস্কারকদের প্রচেষ্টায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং সতীদাহ প্রথার মতো কুপ্রথার অবসান ঘটে।মোটকথা, ঊনবিংশ শতকে ভারতীয় নারীদের জীবন ছিল সংগ্রাম ও বঞ্চনায় পরিপূর্ণ।
উনিশ শতকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, বর্ণ ও জাতি প্রথার বিরুদ্ধে ভারতে বেশ কিছু আন্দোলন হয়েছিল। এই আন্দোলনগুলি মূলত সমাজের নিচু বর্ণের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জাতিভেদ প্রথার বিলুপ্তির জন্য পরিচালিত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে, ডঃ বি.আর. আম্বেদকর এবং ই.ভি. রামাস্বামী পেরিয়ার প্রমুখ ব্যক্তিত্ব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনগুলি জাতিভেদ প্রথার কঠোর সমালোচনা করে এবং এর বিলুপ্তির জন্য সচেষ্ট ছিল। তারা মনে করত যে জাতিভেদ প্রথা সমাজে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। আন্দোলনকারীরা সমাজের সকল বর্ণের মানুষের জন্য সমান অধিকার ও সুযোগের দাবি করে। তারা বিশ্বাস করত যে, জন্মসূত্রে কোনো মানুষ ছোট বা বড় হয় না। বর্ণ ও জাতি প্রথা বিরোধী আন্দোলনগুলি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করে।

তারা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করার পক্ষে ছিল। এই আন্দোলনগুলি রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়। তারা সকল বর্ণের মানুষের জন্য ভোটাধিকার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক অধিকারের দাবি করে। আন্দোলনকারীরা জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সংগঠন তৈরি করে। তারা জনসচেতনতা সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ডঃ বি.আর. আম্বেদকর ছিলেন একজন প্রভাবশালী সমাজ সংস্কারক এবং দলিত নেতা। তিনি দলিতদের অধিকার আদায়ের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন এবং ভারতীয় সংবিধানের খসড়া তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।এই আন্দোলনগুলি ভারতে জাতিভেদ প্রথার অবসান ঘটাতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন ভারতীয় সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। এই আন্দোলনগুলি সমাজের কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল এবং নারী শিক্ষা, নারী অধিকার, এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছিল। এই আন্দোলনগুলি সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, এবং জাতিভেদ প্রথার মতো সামাজিক কুপ্রথার বিরোধিতা করেছিল। নারী শিক্ষার প্রসারে এই আন্দোলনগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নারী শিক্ষার অভাব এবং এর ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল।
এই আন্দোলনগুলির মাধ্যমে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হওয়া হয়েছিল। নারী শিক্ষার প্রসার এবং সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং নিপীড়িত সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি করা হয়েছিল। এই আন্দোলনগুলি সমাজের মধ্যে কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করেছিল। এই আন্দোলনগুলি আধুনিক ভারতের সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই সময়কালে, ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ, রামকৃষ্ণ মিশন ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠন গঠিত হয়েছিল, যা সমাজ সংস্কারের জন্য কাজ করেছিল। এই আন্দোলনগুলি যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে উৎসাহিত করেছিল এবং কুসংস্কার ও ধর্মের নামে ভন্ডামির বিরোধিতা করেছিল। এইসব কারণে, উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন ভারতীয় সমাজে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল এবং একটি আধুনিক, প্রগতিশীল সমাজ গঠনের পথ খুলে দিয়েছিল।