উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন – উনিশ শতকে বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলন ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে, সামাজিক কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, এবং বিভিন্ন কুপ্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে এবং এর প্রতিকার চেয়ে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের উন্নতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।

আরও জানুন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন কেমন ছিল ?

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কালে, ভারতীয় সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, কুপ্রথা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই আন্দোলনগুলির মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সংস্কার এনে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল সমাজ গঠন করা।

এই সংস্কার আন্দোলনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ছিল: –

নারী অধিকারের জন্য সংগ্রাম:-

এই সময়কালে, নারীদের শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সতীদাহ প্রথা রদ, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং বিধবাদের পুনর্বিবাহের মতো বিষয়গুলিতে জোর দেওয়া হয়েছিল।

জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা:-

জাতিভেদ প্রথা, যা সমাজের বিভাজন সৃষ্টি করত, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছিল। সামাজিক সমতা ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা প্রচার করা হয়েছিল।

ধর্মীয় সংস্কার:-

হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার দূর করার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। একেশ্বরবাদ, মূর্তিপূজার বিরোধিতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছিল।

শিক্ষার প্রসার:-

নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য শিক্ষার প্রসারের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক শিক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়েছিল।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি:- 

এই আন্দোলনগুলির মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছিল।

এই সংস্কার আন্দোলনের ফলে সমাজে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। যেমন: সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা হয়েছিল, বাল্যবিবাহের হার কমেছিল, নারীদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছিল, সামাজিক কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছিল, জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটেছিল।

এই সংস্কার আন্দোলনগুলি কেবল বাংলার সমাজেই নয়, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলেছিল এবং একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ভারত গঠনে সহায়ক হয়েছিল।

বিধবা বিবাহ আন্দোলন :-

বিধবা বিবাহ আন্দোলন ছিল উনিশ শতকে ভারতে সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্কার আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, যা সেই সময়ে সামাজিক কুসংস্কারের শিকার ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন এবং তার প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে “হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন” পাশ হয়।

১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই “হিন্দু উইডোস রিম্যারেজ অ্যাক্ট” পাশ হয়। এই আইন অনুসারে, হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহকে বৈধতা দেওয়া হয়।  এই আইন বিধবাদের তাদের মৃত স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার বিধানও বাতিল করে।  এই আইন প্রণয়নে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এই আইনের পক্ষে জনমত গঠন করেন এবং সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেন।

সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলন:-

সতীদাহ প্রথা ছিল একটি প্রাচীন হিন্দু প্রথা, যেখানে একজন মৃত স্বামীর চিতায় তার বিধবা স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। এই প্রথার বিরুদ্ধে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই ভারতবর্ষে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। রাজা রামমোহন রায় এই প্রথার প্রধান বিরোধী ছিলেন এবং তার প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার ১৮২৯ সালে এই প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এই প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ। তিনি এই প্রথার অমানবিক দিক তুলে ধরেন এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন। ব্রিটিশ সরকার প্রথমে এই প্রথা বন্ধ করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, কিন্তু রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টা এবং সমাজের সচেতনতার কারণে ১৮২৯ সালে আইন করে এই প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন :-

ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন ছিল উনিশ শতকে বাংলায় সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এই আন্দোলনের পুরোধা। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুধর্মের কুসংস্কার ও গোঁড়ামি দূর করে একে একটি যুক্তিবাদী ও আধুনিক রূপে প্রতিষ্ঠা করা।

ব্রাহ্ম সমাজ একেশ্বরবাদের উপর জোর দেয় এবং নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার কথা বলে।ব্রাহ্ম সমাজ জাতিভেদ প্রথা, বর্ণ প্রথা, এবং অন্যান্য সামাজিক ভেদাভেদের বিরোধিতা করে। ব্রাহ্ম সমাজ সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদি কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরোধিতা করে। বিধবাদের পুনর্বিবাহের জন্য তারা আন্দোলন করে। ব্রাহ্ম সমাজ নারী ও পুরুষের শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রাহ্ম সমাজ ধর্ম ও সমাজের সংস্কারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। ব্রাহ্ম সমাজ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মিলন ও সম্প্রীতি স্থাপনে কাজ করে।

ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন বাংলা তথা ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এর প্রভাবে নবজাগরণের সৃষ্টি হয় এবং সমাজের কুসংস্কার ও গোঁড়ামি দূর হয়।

নব্য বঙ্গ গোষ্ঠির আন্দোলন:-

নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী, যা ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট নামেও পরিচিত, উনিশ শতকের বাংলার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক আন্দোলন ছিল। এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, যিনি হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, এবং পশ্চিমা শিক্ষার আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। তারা সেকেলে সামাজিক প্রথা, কুসংস্কার, এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা করে, এবং নারী শিক্ষা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, এবং সমাজের প্রগতিশীল সংস্কারের জন্য কাজ করে।

নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রত্যাখ্যান করে যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদী আদর্শের প্রচার করে। তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে আগ্রহী ছিল এবং এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও প্রকাশনা কার্যক্রম চালায়। নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারের জন্য সোচ্চার ছিল। তারা নারী শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা, এবং জাতিভেদ প্রথার মতো সামাজিক কুপ্রথার বিরোধিতা করে সমাজ সংস্কারের জন্য কাজ করে।

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন

Leave a Reply