ইউরোপের ঘটনা (European events) (1937-1945)

ইউরোপের ঘটনা (European events) অনেক প্রাচীন এবং এর ঘটনাগুলোও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে এসেছে। ইউরোপের ইতিহাসকে সাধারণত প্রাগৈতিহাসিক যুগ, ধ্রুপদী প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, এবং আধুনিক যুগ – এই চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। এই সময়ের মধ্যে, ইউরোপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে যা বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলেছে। যেমন, প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার বিকাশ, রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার, মধ্যযুগে সামন্ততন্ত্রের উত্থান, রেনেসাঁ, এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধ।

Table of Contents

READ MORE- জাতিসংঘ (United Nations)

ইউরোপের ঘটনা (European events):-

• রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি:-

১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর এই রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মুসোলিনী আবিসিনিয়া আক্রমণ করলে লিগ অব নেশনস মুসোলিনীকে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অবরোধ জারি করে। লিগের স্থায়ী সদস্য হয়েও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ইতালির সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলে। এদিকে হিটলারও মুসোলিনীর পাশে দাঁড়িয়ে মুসোলিনীকে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকার বিস্তার নীতিতে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হলে উভয়েই ফ্রাঙ্কোর পাশে দাঁড়ান।

ফলে উভয়েই অর্থাৎ মুসোলিনী ও হিটলার পরস্পর কাছে আসেন। এমতাবস্থায় মুসোলিনী ও হিটলারের মধ্যে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে রোম-বার্লিন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি হিটলার রাশিয়ার সাম্যবাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরের মাসেই অর্থাৎ ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর Anti Commintern Pact বা কমিনটার্ন বিরোধী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর ইতালি ওই সাম্যবাদ-বিরোধী চুক্তিতে যোগ দিলে ইতালি, জার্মানি ও জাপানের মধ্যে (Rome-Berlin-Tokeyo Axis Pact) বা রোম-বার্লিন-টোকিও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মুসোলিনী প্রথম এই ‘অক্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। যাইহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির এই রাষ্ট্রগুলি একপক্ষে ছিল আর অপর পক্ষে ছিল মিত্রশক্তি।

• লেলিনগ্রাদ-এর লড়াই:-

লেনিনগ্রাদ রাশিয়ায় অবস্থিত। এই লেনিনগ্রাদের লড়াই বিখ্যাত হয়ে আছে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে নাৎসি বাহিনীর লড়াইয়ের জন্য। আর এই লড়াইয়ের জন্য। আর এই লড়াইয়ে শেষপর্যন্ত রাশিয়াই জয়ী হয়। হিটলার ইংল্যান্ড অভিযান সমাপ্ত রেখে রাশিয়া আক্রমণ করেন। তিনি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন রাশিয়া আক্রমণ করেন। তাঁর এই রাশিয়া আক্রমণ Operation Barbarosa (অপারেশন বারবারোসা) নামে পরিচিত। হিটলার রাশিয়া আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই ইংল্যান্ড রাশিয়ার পাশে দাঁড়ায়। নাৎসি সেনাদলের একাংশ লেনিনগ্রাদে, অন্য আর একটি অংশ মস্কোর ওপর আক্রমণ করে এবং হিটলারের সেনাবাহিনী রাশিয়ার ভেতরে প্রবেশ করে।

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে একদিকে প্রচণ্ড শীত অন্যদিকে জার্মান সৈন্যদের খাবারসহ পোশাক পরিচ্ছদও অপ্রতুল। এই অবস্থায় রাশিয়ান লাল ফৌজ একদিকে রুশ পোড়ামাটি নীতি নেয় অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। রুশ পোড়ামাটি নীতি অনুসারে যে-অঞ্চলে জার্মান সৈন্য প্রবেশ করেছে, সেই অঞ্চলে আগে থেকেই খাদ্য, শস্য নষ্ট করে দেওয়া হয়। জলে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়। ফলে জার্মান সেনার অনেকেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সমস্যায় পড়ে। এই অবস্থায় রাশিয়ান লাল ফৌজ জার্মান সেনার ওপর পাল্টা মার দিতে থাকে। ফলে জার্মান সেনারা পরাজিত হয় এবং অবশেষে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি রাশিয়ায় অবস্থিত নাৎসি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। হিটলারের রাশিয়া অভিযানের ব্যর্থতা তাঁর পতনের পথকে অনেকটাই প্রশস্ত করে দেয়।

• পার্ল হারবারের ঘটনা:-

প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত পার্ল হারবার ছিল মার্কিন বাহিনীর অন্যতম সামরিক ঘাঁটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই আমেরিকা এখানে সৈন্য ও অস্ত্র বৃদ্ধি করে চলেছিল। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর জাপানি আক্রমণে পার্ল হারবার নৌঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। হঠাৎ করে জাপানের এই আক্রমণের ফলে প্রায় আড়াই হাজার আমেরিকান প্রাণ হারায়, এমনকি কুড়িটি বড়ো জাহাজসহ শতাধিক যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়। এই ঘটনার পর মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ৮ ডিসেম্বর আমেরিকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের ফলে মিত্রপক্ষের শক্তি যেমন বৃদ্ধি পেয়েছিল ঠিক তেমনি আমেরিকা এই পার্ল হারবারের ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছিল হিরোসিমা ও নাগাসাকিতেও পরমাণু বোমা বর্ষণ করে।

• হিরোসিমা ও নাগাসাকি:-

হিরোসিমা ও নাগাসাকি জাপানের দুটি শহর। হিরোসিমা শুধু জাপানের একটি শহরই ছিল না, তার সঙ্গে এটি জাপানের অন্যতম সামরিক ঘাঁটি। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে এনোলাগে বিমানের সাহায্যে কর্ণেল পল ডব্লু টিবেটস নামক ব্যাক্ত হিরোসিমা শহরে আমেরিকায় প্রথম পরমাণু বোমা Little boy নিক্ষেপ করে। এর ফলে ৮০,০০০ মানুষ নিহত হয় ও ৭০,০০০ মানুষ আহত হয়। এরপর ৯ আগস্ট জাপানের আর একটি শহর নাগাসাকিতে আমেরিকা তাদের দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। পরমাণু বোমাটির নাম ছিল Fatman। বোমাটি চার্লস বাক সুহান নামক ‘বকস্ কার’ বিমানের সাহায্যে বেশি ছিল। উক্ত বোমার আঘাতে নাগাসাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয়। শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে জাপান ১৫ আগস্ট মিত্রপক্ষের টোকিও উপসাগরে মিসোরি যুদ্ধজাহাজে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে। ফলে

♦ নারদনিক আন্দোলন:-

রুশ শব্দ নারোদ। উনিশ শতকে রাশিয়ার আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ আস্থা ছিল কৃষক সম্প্রদায়। তাদের জন্য এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। তারা বাকুনিন, লাভমভ প্রমুখের চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হলেও মার্কসবাদী মতবাদ তাদের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলেনি। তারা কোনোরকম রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে চায়নি। নারদনিকরা প্রচলিত তৎকালীন সমাজব্যবস্থার বিরোধী ছিল। তাদের ধারণা ছিল কৃষক বিপ্লবের চাপে প্রচলিত ব্যবস্থার পতন ঘটবে।

নারদনিকদের মধ্যে আবার মতভেদ ছিল। বাকুনিনের অনুগামীরা মনে করত জনগণ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত কিন্তু লাভরভের অনুগামীরা তা মনে করত না। বরং তারা মনে করতো এর জন্য সময় ও শিক্ষা প্রয়োজন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের বসন্তে ও গ্রীষ্মে নারদনিক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। কৃষকদের মধ্যে তারা তাদের মতবাদ প্রচার করার জন্য শিক্ষিত যুবকেরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাদের মতবাদ প্রচার করতে থাকে। কিন্তু সংগঠন ও কৃষকদের পূর্বপ্রস্তুতির অভাবে তারা ব্যর্থ হয়, তবু তাদের আন্দোলনের জন্যই রাশিয়ার কৃষকেরা সংগঠিত হতে পেরেছিল।

♦ মুক্তিদাতা জার কাকে বলা হয় এবং কেন?:-

সুদীর্ঘকাল ধরে রাশিয়ার জনসংখ্যার অধিকাংশই ছিল ‘ভূমিদাস’ বা ‘সার্ফ’। অভিজাত সম্প্রদায়ের শাসন ও শোষণ ভূমিদাসদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল। ভূমিদাসরা মাঝে মাঝে অভিজাতদের অধীনতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও তারা সফল হতে পারেনি। এইরূপ রাজনৈতিক ঘনঘটা পরিস্থিতিতে মনে মনে দাঁড়কাক হয়েও ময়ূরের মতো পেখম তুলে আবির্ভূত হয়েছিলেন রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার (১৮৫৫-৮১ খ্রিস্টাব্দ) অর্থাৎ তিনি রাজতন্ত্রের সমর্থক হলেও জনগণের কাছে গণতন্ত্রের কথা দিতেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেই রুশ সমাজের এক কলঙ্কজনক বৈশিষ্ট্য ভূমিদাস প্রথার অবসান করেন। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘মুক্তির ঘোষণা’ (Edict of Emancipation) দ্বারা। দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদসাধন করায় তাঁকে ‘মুক্তিদাতা জার’ (Czar Liberator) বলা হয়।

♦ ডুমা ও মীর:-

রাশিয়ার জাতীয় পরিষদকে বলা হয় ‘ডুমা’। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের পর জার দ্বিতীয় নিকোলাস ‘ডুমা’ গঠনের অনুমতি দিয়েছিলেন। ‘মীর’ রাশিয়ার গ্রাম্য সমিতির নাম। জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ভূমিদাসদের মুক্ত করে তাদের যে জমি দিয়েছিলেন, তাতে কৃষকদের ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত হয়নি। মীর নামক গ্রাম্য সমিতির দ্বারা জমির স্বত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এর ফলে কৃষকরা ‘মীর’-এর দ্বারা নির্যাতিত হতে থাকে।

♦ ডেকাব্রিস্ট বিদ্রোহ:-

১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের ১ ডিসেম্বর জার প্রথম আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন তাঁর অন্যতম পুত্র প্রথম নিকোলাস। কিন্তু সিংহাসনে বসার বৈধ উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রথম আলেকজান্ডারের জ্যৈষ্ঠ পুত্র প্রথম কনস্টানটাইন। নিকোলাসের সিংহাসনে আরোহণ রাশিয়ার বহু সরকারি কর্মচারী মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারেনি। ফলে ক্ষুব্ধ জনগণ ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর পেট্রোগাড শহরে এক অভ্যুত্থানে সামিল হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসে এই অভ্যুত্থান হয়েছিল বলে এই বিদ্রোহ ‘ডিসেমব্রিস্ট’ বা ‘ডেকাব্রিস্ট’ বিদ্রোহ নামে খ্যাত।

♦ নিহিলিজম কথাটির অর্থ কি ও একথাটি সর্বপ্রথম কে কোন্ উপন্যাসে ব্যবহার করেন?:-

‘নিহিলিজম’ কথাটির অর্থ হল নৈরাজ্যবাদী রাজনৈতিক দর্শন। রাশিয়ায় এই আন্দোলনের মূল কথা ছিল ‘নিরঙ্কুশ ব্যক্তিত্ববাদ’ (absolute individualism)। ‘নিহিলিজম’ কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন বিখ্যাত রুশ ঔপন্যাসিক তুর্গেনিভ। (১৮১৮-৮৩ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর “Fathers and sons” উপন্যাসে।

♦ নিহিলিস্ট আন্দোলন’ বা নিহিলিজমদের প্রধান উদ্দেশ্য:-

রাশিয়ায় সংঘটিত (জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সময়কালে) নিহিলিস্ট আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পুরাতন ব্যবস্থা অর্থাৎ জারতন্ত্র, অর্থোডক্স গির্জা এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে তার উপর এক নতুন জনহিতকর সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করা। অর্থাৎ আন্দোলনকারীরা ঐতিহ্য ও প্রচলিত ধ্যান-ধারণার অবসান ঘটিয়ে সমাজকে যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক করে তুলতে চেয়েছিল।

♦ থার্ড সেকশন:-

থার্ড সেকশন ছিল রাশিয়ার এক গুপ্ত পুলিশ ও গোয়ন্দো বাহিনী। জেনারেল বেঙ্কেন ডর্ফের অধীনে এই গুপ্ত বাহিনী সমগ্র দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। বিনা বিচারে কারাদণ্ড, হত্যা, নির্বাসন চালিয়ে এই বাহিনী ‘বিপ্লবী শুপ্ত সমিতিগুলির’ মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এটা গঠন করেন জার প্রথম নিকোলাস এবং এটিকে ধ্বংস করেছিলেন জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

♦ বুলিঘিন শাসনতন্ত্র:-

রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাস ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘বুলিখিন শাসনতন্ত্র’ নামে একটি শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করেন। এই শাসনতন্ত্র অনুসারে তিনি জাতীয় সভার পরিবর্তে একটি ইম্পিরিয়াল ডুমা (রাশিয়ার জাতীয় পরিষদকে বলা হয় ডুমা) স্থাপনের কথা ঘোষণা করেন। অবশ্য এই সভা কেবল পরামর্শদানের ক্ষমতা পেয়েছিল।

♦ ‘স্টলিপিন প্রতিক্রিয়া’:-

জার দ্বিতীয় নিকোলাসের প্রধানমন্ত্রী রূপে স্টলিপিন ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ণ সন্ত্রাসমূলক শাসন অব্যাহত রাখেন। অবশ্য অন্তরে রক্ষণশীল হলেও প্রয়োজনবোধে উদার নীতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনেও তিনি কুণ্ঠিত ছিলেন না। যাই হোক, বৃটিশের দমননীতির সাহায্যে সন্ত্রাসবাদী ও বিপ্লববাদীদের দমন করার ফলে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে এক আততায়ীর হাতে তাঁর মৃত্যু হয়। এটিই ‘স্টলিপিন প্রতিক্রিয়া’ নামে খ্যাত।

♦ নারোদনায়া ভল্যা’র আদি ইতিহাস:-

১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ‘জেমলিয়া-ই-ভলিয়া’ (অর্থাৎ ‘জমি ও স্বাধীনতা’) নামে একটি গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে। এই গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যেই দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠরা গঠন করে ‘নারোদনায়া ভল্যা’ (The people will- জনতার ইচ্ছা) এবং বাকিরা গঠন করে ‘চেরী পেরিডল’ (কৃষ্ম বাঁটোয়ারা)। এই দলের অধিকাংশই ছিল পূর্বতন নিহিলিস্ট। ‘নারোদনায়া ভল্যা’ খুব দ্রুত গতিতে সংগঠিত হয়ে জঙ্গী ক্রিয়াকলাপ শুরু করে এবং রাজকর্মচারীদের হত্যার কর্মসূচি নেয়।

♦ ‘ওয়ার-কমিউনিজম’:-

রাশিয়ার গৃহযুদ্ধকালে আর্থিক সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে বলশেভিক সরকার (যার প্রধান ছিলেন লেনিন) ১৮১৮-১৮২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে যে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল তা ‘ওয়ার কমিউনিজম’ বা ‘যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল এবং সকল উদ্যোগের জাতীয়করণ করা হয়েছিল।

♦ ‘বুলাঞ্জিস্ট আন্দোলন’:-

ফ্রান্সে তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের শাসনকালে সামরিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত জনপ্রিয় মন্ত্রী বুলাঞ্জার প্রজাতান্ত্রিক সরকারের পতন ও তার সংবিধান সংশোধনের দাবি তোলেন। প্রজাতন্ত্র সরকারের পতন এবং একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বুলাঙ্গারের নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা ‘বুলাজিস্ট আন্দোলন’ নামে পরিচিত। প্রজাতান্ত্রিক সরকার বিদ্রোহী হিসেবে তাঁকে অভিযুক্ত করলে তিনি বেলজিয়ামে পলায়ন করেন (১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি) এবং সেখানে ত্রিশ মাস পরে আত্মহত্যা করেন। উল্লেখ্য তৃতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে এই আন্দোলন শুরু হলেও এই আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় প্রজাতন্ত্র সরকার কঠোর হাতে দমন করেছিল।

♦ ‘ল অফ অ্যাসোসিয়েশন’:-

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি তৃতীয় প্রজাতান্ত্রিক সরকার ‘ল অফ অ্যাসোসিয়েশন’ নামক আইন প্রণয়ন করে স্থির করে যে, ‘সরকারের বিনা অনুমতিতে কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংঘ গঠন করা যাবে না। যদি কেউ গোপনে প্রতিষ্ঠা করে তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। অর্থাৎ এই আইন ছিল কঠোর বা অমান্য করার কোনো উপায় ছিল না।

♦ ‘ডেফ্রুস ঘটনা’:-

আলফেড ডেজুস ছিলেন একজন ইহুদি সামরিক বাহিনীর জনৈক ক্যাপ্টেন। তিনি জামানির নিকট গোপন সামরিক তথ্য পাচারের অভিযোগে ধৃত হন (১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে)। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফরাসিবাদী দু’দলে বিভক্ত হয়ে যায়। পরস্পরের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের ফলে ফরাসি সরকার এক অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়। অবশেষে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে পুনর্বিচারে ড্রেফুস নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং তাঁকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়ে পুনরায় উচ্চপদে আসীন করা হয়। এটিই ড্রেফুস ঘটনা নামে পরিচিত।

♦ ‘র‍্যাপালোর সন্ধি’:-

১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘র‍্যাপালোর সন্ধি’। এই সন্ধির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার মাটিতে জার্মানির সামরিক বাহিনীকে রাশিয়ার পদ্ধতিতে শিক্ষাদান ও মিত্রপক্ষের বেষ্টনীকে যৌথ উদ্যোগে ভেঙে ফেলা। এর পরিবর্তে স্থির হয়, জার্মানি রাশিয়াকে স্বীকৃতি দেবে এবং বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করবে।

♦ ‘স্পার্টাসিস্ট বিদ্রোহ’:-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে জার্মানিতে রোজা লুক্সেমবুর্গ ও কার্ল লাইবনেক্ট-এর নেতৃত্বে যে বামপন্থী বা কমিউনিস্ট দল গড়ে উঠেছিল তা ‘স্পার্টাসিস্ট’ নামে খ্যাত। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটলেও কমিউনিস্টগণ তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সেই কারণে তারা ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে অতর্কিতভাবে বার্লিন অবরোধ করে কিন্তু সেই আন্দোলন ব্যর্থ হয়। উত্তেজিত জনতা লুক্সেমবুর্গ ও লাইবনেক্টকে হত্যা করে। জার্মানির ইতিহাসে এই ঘটনাই ‘স্পার্টাসিস্ট বিদ্রোহ’ নামে খ্যাত।

♦ ওয়াশিংটন কনফারেন্স:-

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্ডিঞ্জ ওয়াশিংটন কনফারেন্স-এর আহ্বান করেন। নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে বিশ্বকে যুদ্ধমুক্ত করবার ও আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে হার্ডিঞ্জ এই কনফারেন্স-এর আহ্বান করেন। এই সম্মেলনে চিন, জাপান, ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা প্রভৃতি রাষ্ট্র যোগদান করে নৌ-বল হ্রাস চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাপানের প্রভাব ও কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রিত করা ছিল এই সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য।

♦ জেনেভা প্রোটোকল:-

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটার পর ইউরোপের রাজনীতির প্রধান সমস্যা ছিল ফ্রান্সের নিরাপত্তা। সামান্যতম সুযোগ পেলেই জার্মানি ফ্রান্সকে আক্রমণ করবে- এই ছিল ফ্রান্সের ধারণা। এই উদ্দেশ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার জন্য গ্রিক ও চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রতিনিধিগণ লিগের সাধারণ সভায় যে চুক্তিপত্র করেছিল তা Protocol for the Pacific Settlement of International, Disputes বা জেনেভা প্রোটোকল নামে খ্যাত (১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ)। এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রবর্গ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যৌথভাবে ব্যবস্থা অবলম্বন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল।

• এক নজরে ইউরোপ:-

(১) গণতন্ত্রকে ইংরেজিতে Democracy বলে। Demos অর্থাৎ জনগণ ও Kratia অর্থাৎ শাসন বা কর্তৃত্ব অর্থাৎ গণতন্ত্র বলতে বোঝায় জনগণের শাসন।

(২) ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ দুটিই একনায়কতন্ত্রী মতবাদ। এই দুটি মতবাদই একটি রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত কর্তৃত্বে বিশ্বাসী।

(৩) ফ্যাসিবাদী ও নাৎসিবাদী আগ্রাসন গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল।

(৪) অধ্যাপক এ জে পি টেলর মনে করেন ভার্সাই সন্ধির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল। মিউনিখ চুক্তির দ্বারা হিটলার চেকশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল দখলের অধিকার পেলেও তিনি সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নিয়েছিলেন।

(৫) ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে ও সেখানে তাদের অনুগত মাঞ্চুকুয়ো সরকার গঠন করে। হিটলারের আত্মজীবনী-র নাম ‘Mein Kampf’ বা আমার সংগ্রাম। এই গ্রন্থটিকে নাৎসিবাদের বাইবেল বলা হয়। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে।

(৬) হিটলারের বিমানবাহিনীর নাম লুফৎওয়াফ এবং গুপ্ত পুলিশ বাহিনীর নাম গেস্টাপো।

(৭) হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের নাম ছিল শ্বেত অভিযান, ইংল্যান্ড আক্রমণের নাম ছিল সমুদ্রসিংহ ও রাশিয়া আক্রমণের নাম ছিল বারবোরোসা অভিযান।

(৮) ইতালি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

(৯) নাৎসিবাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে ফ্রান্সকে উদ্ধার করার জন্য যেদিনটিকে মিত্রপক্ষের বাহিনী বেছে নিয়ে তাদের অভিযান শুরু করেছিল, সেই দিনটিকে D. Day অর্থাৎ Deliverance Day অর্থাৎ নিষ্কৃতি দিবস বলা হয়। দিনটি ছিল ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন।

(১০) ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে জার্মান বাহিনী প্রকৃতপক্ষে মিত্রপক্ষের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে। তাই ওই দিনটিকে V. E. Day বা Victory in Europe Day বলা হয়।

(১১) ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদানের মাধ্যমে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

(১২) জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে যে-দুটি পরমাণু বোমা ফেলা হয়েছিল তাদের নাম হল লিটিল বয় (Little boy) এবং ফ্যাটম্যান (Fatman)।

(১৩) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক শক্তিধর দেশ হিসেবে আমেরিকা ও রাশিয়ার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

(১৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইউরোপে আক্ষরিক অর্থে ঠাণ্ডা লড়াই বিস্তারলাভ করেছিল।

(১৫) বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে চলা যুদ্ধগুলির মধ্যে একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই পরমাণু বোমা ব্যবহৃত হয়েছিল।

ইউরোপের ঘটনা (European events) (1937-1945)

 

Leave a Reply