You are currently viewing ইউরোপের ইতিহাসের কয়েকটি সন্ধি
(SOME TREATIES IN EUROPEAN HISTORY) (1802-1939)

ইউরোপের ইতিহাসের কয়েকটি সন্ধি

ইউরোপের ইতিহাসের কয়েকটি সন্ধি (SOME TREATIES IN EUROPEAN HISTORY) (1802-1939). ইউরোপের ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সন্ধি হয়েছে, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –

Table of Contents

আরও জানুন- জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন

ইউরোপের ইতিহাসের কয়েকটি সন্ধি (SOME TREATIES IN EUROPEAN HISTORY)

♦ অ্যামিয়েন্সের সন্ধি (১৮০২ খ্রিস্টাব্দ):-

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ‘মিয়েন্সের সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়। সন্ধির শর্তনুসারে ফ্রান্স নেপলস্ ও পোপের রাজ্য থেকে সরে যেতে এবং মিশর প্রত্যর্পণ করতে রাজি হয়। পরিবর্তে ইংল্যান্ড মাল্টা ছেড়ে দিতে এবং সিংহল ও ত্রিনিদাদ ব্যতীত অন্যান্য স্থান ফ্রান্সকে প্রত্যর্পণ করতে স্বীকৃত হয়।

♦ প্রেসবার্গের সন্ধি (১৮০৫ খ্রিস্টাব্দ):-

অস্ট্রিয়া ও নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মধ্যে এই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধি দ্বারা অস্ট্রিয়া নেপোলিয়নকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ব্যাভেরিয়া ও উরটেমবার্গকে স্বাধীনতা প্রদান করে এবং কয়েকটি ভূ-খণ্ড ফ্রান্সকে অর্পণ করে। এই সন্ধির ফলে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর ও রাইন নদীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং অস্ট্রিয়া একটি দ্বিতীয় শ্রেণির রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

♦ টিলজিটের সন্ধি (১৮০৭ খ্রিস্টাব্দ):-

অস্টারলিজের যুদ্ধে সাফল্যের পর ফরাসি বাহিনি পোল্যান্ডের দিকে অগ্রসর হলে রাশিয়া বাধা দেয়। ফ্রীডল্যান্ডের যুদ্ধে (জুন, ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দ) রাশিয়া নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাতে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। অতঃপর রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার নেপোলিয়নের সঙ্গে টিলজিটের চুক্তি স্বাক্ষর করে মিত্রতাবদ্ধ হন। তিনটি পৃথক চুক্তির সমন্বয়ে টিলজিটের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল।

♦ ক্যালিশের চুক্তি (১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ):-

নেপোলিয়নের পক্ষ ত্যাগ করে প্রাশিয়া রাশিয়ার সঙ্গে ‘ক্যালিশের চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চুক্তির শর্তানুযায়ী ঠিক হয়, প্রাশিয়া পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদের ফলে প্রাপ্ত এলাকা রাশিয়াকে প্রদান করবে। পরিবর্তে প্রাশিয়া স্যাক্সনি দখল করবে।

♦ আঙ্কেয়ার স্কেলেসির সন্ধি (১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ):-

তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দ্বারা রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ বস্ফরাস প্রণালীতে যাতায়াতের অবাধ অধিকার লাভ করে। স্থির হয়, যুদ্ধের সময় একমাত্র রুশ যুদ্ধজাহাজ দার্দানেলিস প্রণালীতে প্রবেশ করবে। এই চুক্তির ফলে তুরস্কের ওপর রুশ-কর্তৃত্ব ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায়।

♦ লন্ডনের সন্ধি (১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ):-

ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘লগুনের সন্ধি’-র ফলে রাশিয়া উন্‌কয়ার স্কেলেসি সন্ধি দ্বারা প্রাপ্ত কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা ছাড়তে বাধ্য হয়। আরও স্থির হয়, মহম্মদ আলি বংশানুক্রমিকভাবে মিশরের ‘পাশা’ পদ লাভ করবেন, বিনিময়ে তিনি সিরিয়া সম্পর্কিত সমস্ত দাবি তুরস্কের অনুকূলে ত্যাগ করবেন।

♦ প্যারিসের সন্ধি (১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ):-

প্যারিসের সন্ধি দ্বার ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অবসান ঘটে। সন্ধির শর্তানুসারে, রাশিয়া তুরস্কের ওপর প্রাপ্ত সুবিধা ও অধিকার ত্যাগ করে। মলডাভিয়া ওয়ালাচিয়া তুরস্কের অধীনে স্বশাসিত দেশে পরিণত হয়। তুরস্ক ইউরোপীয় সংঘের সদস্যপদ অর্জন করে।

♦ প্লমবিয়ার্সের চুক্তি (১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ):-

ফরাসিরাজ তৃতীয় নেপোলিয়ন ও সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট কাভুরের মধ্যে প্লমবিয়ার্সের গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্থির হয়, অস্ট্রিয়া কর্তৃক সার্ডিনিয়া আক্রান্ত হলে ফ্রান্স সার্ডিনিয়াকে সাহায্য করবে। বিনিময়ে লাভ করবে ‘স্যভয়’ ও ‘নিস্’ নামক দুটি অঞ্চল।

♦ ভিল্লাফ্রাঙ্কার চুক্তি (১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ):-

তৃতীয় নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়ার সঙ্গে গোপনে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে অস্ট্রিয়া ও সার্ডিনিয়ার যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই ঘটনায় কাভুর প্রচণ্ডক্ষুদ্ধ হন।

♦ জুরিখের সন্ধি (১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ):-

অস্ট্রিয়া ও সার্ডিনিয়ার মধ্যে ‘জুরিখের সন্ধি’ দ্বারা যুদ্ধবিরতি ঘটে। স্থির হয়, ‘লোম্বাডি’ ও ‘ভেনিস’ যথাক্রমে সার্ডিনিয়া ও অস্ট্রিয়ার অধিকারে থাকবে। পার্সা, মডেনা, টাস্কানি প্রভৃতি রাজ্যের বিতাড়িত শাসকরা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন।

♦ গ্যাস্টিনের সন্ধি (১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ):-

অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দ্বারা অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়া যুগ্মভাবে স্লেজউইগ, হলস্টাইন ডাচি (প্রদেশ) দুটির কর্তৃত্ব লাভ করে। হলস্টানের কিয়েভ বন্দর লাভ করে অস্ট্রিয়া।

♦ প্রাগের সন্ধি (১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ):-

স্যাডোয়ার যুদ্ধে বিপর্যস্ত হওয়ার পর অস্ট্রিয়া প্রাশিয়ার সঙ্গে এই সন্ধি স্বাক্ষর করে। সন্ধির শর্তানুযায়ী প্রাশিয়ার নেতৃত্বে উত্তর-জার্মান রাষ্ট্র-সংঘ গঠনে অস্ট্রিয়া স্বীকৃতি দেয়, ইতালি ভেনেসিয়া লাভ করে। অস্ট্রিয়া জার্মান কনফেডারেশন ত্যাগ করে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়।

♦ ফ্রাঙ্কফোটের সন্ধি (১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ):-

বিসমার্কের হাতে সেন্ডানের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ফ্রান্স প্রাশিয়ার সঙ্গে এই সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সন্ধির শর্তানুযায়ী, ফ্রান্স আলসাস্ ও লোরেন প্রাশিয়াকে প্রদান করে, দক্ষিণ-জার্মান রাষ্ট্রগুলির একীকরণ ফ্রান্স মেনে নেয়, ফ্রান্স যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।

♦ তিন সম্রাট মৈত্রী (ড্রাইকাইজারবুন্ড, ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ):-

বিসমার্কের উদ্যোগে প্রাশিয়া, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সম্রাটেরা এই মৈত্রী চুক্তির স্বাক্ষর করেন। এটি বিসমার্কের কূটনৈতিক সাফল্যের অনন্য উদাহরণ। ১৮৭৮-এ এই চুক্তি ভেঙে রাশিয়া বেরিয়ে যায়। তবে বিসমার্ক ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে তিন সম্রাটের চুক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই চুক্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রগুলির কেউ চতুর্থ কোনো রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্যরা নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। তবে বলকান অঞ্চলকে কেন্দ্র করে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার স্বর্ণদ্বন্দু ছিল প্রবল। তাই এই চুক্তি বেশিদিন কার্যকারী থাকেনি।

♦ রাইখস্ট্যান্ডের চুক্তি (১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ):-

রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। স্থির হয় যে, সম্ভাব্য রুশ-তুরস্ক যুদ্ধে অস্ট্রিয়া নিরপেক্ষ থাকবে। এর পরিবর্তে অস্ট্রিয়া, বসনিয়া ও হারজিগোভিনার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে।

♦ স্যান-স্টিফানোর সন্ধি (১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দ):-

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তুরস্ক ‘স্যান-স্টিফানোর সন্ধি’ স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সন্ধির দ্বারা তুর্কী-সুলতান মন্টিনিগ্রো, সার্বিয়া ও রুমানিয়ার ‘স্বাধীনতা স্বীকার করে নেন। রাশিয়া কারস্, বাটুম, বেসারাবিয়া প্রভৃতি স্থান লাভ করে। বৃহৎ বুলগেরিয়া রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। বসনিয়া-হারজিগোভিনার ওপর অস্ট্রো-রুশ যুগ্ম কর্তৃত্ব স্থাপিত হয় ইত্যাদি। এই চুক্তি নিকট-প্রাচ্যে রুশ-অগ্রগতি নিশ্চিত করে।

♦ বার্লিন চুক্তি (১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দ):-

‘স্যান-স্টিফানোর সন্ধি’ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বার্লিন কংগ্রেসে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘বার্লিন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রবর্গের অন্যতম ছিল রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, তুরস্ক, জার্মানি প্রভৃতি। চুক্তি দ্বারা স্থির হয়, রুমানিয়া, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো স্বাধীনতা পাবে। বৃহৎ বুলগেরিয়া ভেঙে দুটি রাজ্য হবে। বসনিয়া, হারজিগোভিনায় অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব থাকবে, রাশিয়া কিছু কিছু সার্বভৌমিক ও সামরিক অধিকার ত্যাগ করবে, ইংল্যান্ড সাইপ্রাস লাভ করবে ইত্যাদি।

♦ দ্বিশক্তি চুক্তি (১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দ):-

বার্লিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্ধ হয়ে রাশিয়া তিন সম্রাটের মৈত্রী ত্যাগ করলে বিসমার্ক অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে দ্বিশক্তি মৈত্রী গঠন করেন। স্থির হয়, এদের কেউ তৃতীয় রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্যজন আক্রান্ত মিত্রকে সাহায্য করবে।

♦ ত্রিশক্তি চুক্তি (১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ):-

বিসমার্কের উদ্যোগে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালির মধ্যে ত্রিশক্তি চুক্তি জোট গড়ে উঠেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই জোট ছিল অন্যতম পক্ষ, তবে ইতালি যুদ্ধের মাঝপথে এই পক্ষ ত্যাগ করেছিল। 

♦ রি-ইনশিয়োরেন্স সন্ধি (১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ):-

বিসমার্ক গোপনে রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। রাশিয়া ইতিমধ্যেই তিন সম্রাটের চুক্তি ত্যাগ করেছিল। এরপর বুলগেরিয়া গঠনের প্রশ্নে রাশিয়ার সঙ্গে অস্ট্রিয়ার বিরোধ দেখা দিলে বিসমার্ক চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, এই যুদ্ধে তিনি মিত্র হিসেবে অস্ট্রিয়াকে সাহায্য করতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে রাশিয়া জার্মানির প্রধান শত্রু ফ্রান্সের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে। এই ভয়ে তিনি ‘রি-ইনশিয়োরেন্স চুক্তি’ স্বাক্ষর করে রাশিয়ার নিরপেক্ষতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যান।

♦ ইংল্যান্ড-জাপান মৈত্রী চুক্তি (১৯০২ খ্রিস্টাব্দ):-

এটি ছিল একটি আত্মরক্ষামূলক চুক্তি। এতে স্থির হয় যে, কোনো একটি পক্ষ তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হলে দ্বিতীয়জন নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে। কিন্তু দুই বা আরও বেশি রাষ্ট্র দ্বারা একজন আক্রান্ত হলে অপরজন মিত্র পক্ষের হয়ে যুদ্ধে যোগ দেবে।

♦ ইঙ্গ-ফরাসি আন্তরিক মৈত্রী (আঁতাত কর্ডিয়েল ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ):-

এই চুক্তি আঁতাত দ্বারা উভয় দেশ তাদের পারস্পরিক বিরোধ মিটিয়ে নেয়। মিশরে ইংল্যান্ডের এবং মরক্কোতে ফ্রান্সের অধিকার স্বীকৃত হয়। এটি কোনো সামরিক চুক্তি ছিল না। এই চুক্তির ফলে উভয় দেশের মধ্যে বিবাদের নিষ্পত্তি হয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

♦ লণ্ডন সন্ধি (১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ):-

বলকান সংঘভুক্ত রাষ্ট্রগুলির কাছে পরাজিত তুরস্ক ‘লন্ডন সন্ধি’ স্বাক্ষর করে প্রথম বলকান যুদ্ধের অবসান ঘটায়। এই চুক্তি দ্বারা কেবল কনস্ট্যান্টিনোপল ও ব্রেসের একাংশ ছাড়া সমস্ত বলকান অঞ্চল স্বাধীনতা অর্জন করে। ক্রিট গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউরোপীয় ভূ-খণ্ডে তুরস্কের দীর্ঘ পাঁচশো বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে।

♦ বুখারেস্টের সন্ধি (১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ):-

এই সন্ধি দ্বারা দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধের অবসান ঘটে। বুলগেরিয়া পরাজিত হয়ে এই সন্ধি স্বাক্ষর করে। শর্তানুযায়ী বুলগেরিয়া সার্বিয়া ও গ্রিসকে ম্যাসিডোনিয়ার বহু অংশ ছেড়ে দেয়। রুমানিয়া বুলগেরিয়ার একাংশ লাভ করে ইত্যাদি।

♦ ব্রেস্ট-লিটভস্ক-এর সন্ধি (১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ):-

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া এবং জার্মানির মধ্যে ‘বেস্ট-লিটঙ্ক-এর সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই সন্ধি দ্বারা রাশিয়া জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ মিটিয়ে নেয় এবং পরিবর্তে পোল্যান্ড, বাল্টিক প্রভৃতি কয়েকটি অঞ্চল জার্মানিকে ছেড়ে দেয়।

♦ ভার্সাই সন্ধি (১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ):-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর মিত্র শক্তিবর্গের সঙ্গে পরাজিত জার্মানির ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই সন্ধি দ্বারা জার্মানির বহু ভূ-খণ্ড, সামরিক অস্ত্রাদি মিত্রশক্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল। জার্মানি বিরাট অঙ্কের অর্থ ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে সম্মত হয়েছিল। জার্মানি এই চুক্তিকে একটি ‘জবরদস্তিমূলক চুক্তি’ বলে অভিহিত করে।

♦ সেন্ট জার্মেন-এর সন্ধি (১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ):-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্র রাষ্ট্রবর্গের সঙ্গে পরাজিত অস্ট্রিয়ার এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী অস্ট্রিয়া তার বহু ভূ-খণ্ড, উপনিবেশ, রণতরি, বাণিজ্যপোত এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বাধ্য হয়।

♦ নিউলির সন্ধি (১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ):-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তিবর্গের সঙ্গে পরাজিত বুলগেরিয়া ‘নিউলির চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি দ্বারা বুলগেরিয়া তার কিছু ভূ-খণ্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তার সৈন্যসংখ্যা মাত্র কুড়ি হাজারে নির্দিষ্ট করা হয়। এছাড়াও বুলগেরিয়া বহু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।

♦ ট্রিয়াননের সন্ধি (১৯২০ খ্রিস্টাব্দ):-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরাজিত হাঙ্গেরির সঙ্গে মিত্রশক্তিবর্গ ‘ট্রিয়াননের সন্ধি’ স্বাক্ষর করে। হাঙ্গেরি বহু ভূ-খণ্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, সামরিক শক্তি হ্রাস করতে ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকৃত হয়?

♦ সেভরের সন্ধি (১৯২০ খ্রিস্টাব্দ):-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্ক ও মিশ্রশক্তির মধ্যে ‘সেভরের চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। মিশর, সুদান, সাইপ্রাস, মরক্কো, টিউনিস প্রভৃতি স্থানের ওপর তুরস্ক অধিকার ত্যাগ করে। আরব, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়াও তুরস্কের অধিকারচ্যুত হয়। অবশ্য তুর্কি সুলতানের এই চুক্তি শেষপর্যন্ত সংশোধিত হয় ‘ল্যামেনের চুক্তি’ (১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে) স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

♦ লোকার্নো চুক্তিসমূহ (১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ):-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপের উত্তেজনা, সন্দেহ ও পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি অবসানের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতা সুইজারল্যান্ডের লোকার্নো শহরে সমবেত হয়েছিলেন। এখানেই প্রথম পরাজিত জার্মানিকে আহ্বান করা হয়। লোকর্নোতে মোট ৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি ছিল পারস্পরিক অঙ্গীকারমূলক চুক্তি এবং চারটি ছিল সালিশিমূলক চুক্তি।

♦ কেলগ-ব্রিয়াঁ চুক্তি (১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ):-

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিয়া ও মার্কিন রাষ্ট্রসচিব কেলগ এই চুক্তির উদ্ভাবক। এতে উভয় দেশ যুদ্ধবর্জনকে জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করে। পরে ইউরোপের আরও বহু রাষ্ট্র এই চুক্তির অংশীদার হয়।

♦ মিউনিখ চুক্তি (১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ):-

জার্মানি, ইত্যালি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের চার প্রধান যথাক্রমে হিটলার, মুসোলিনি, চেম্বারলেরন এবং দালাদিয়ের মিউনিখে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এতে স্থির হয় যে, চেকোশ্লোভাকিয়ার অন্তর্ভুক্ত সুদেতান অঞ্চল জার্মানির অন্তর্ভুক্ত হবে। আশ্চর্যের ব্যাপার যে, এই বৈঠকে চেকোশ্লোভাকিয়ার কোনো প্রতিনিধিকে ডাকা হয়নি। এই চুক্তি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জার্মানি তোষণের এক নির্লজ্জ উদাহরণ।

♦ ইস্পাত চুক্তি (১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ):-

হিটলার ও মুসোলিনি ‘ইস্পাত চুক্তি’ স্বাক্ষর করে নিজেদের মৈত্রী দৃঢ়তর করেন। এর অন্যতম শর্ত ছিল যে, উভয় দেশের জনগণের বাঁচার মতো স্থান ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য উভয় দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে কার করে যাবো।

♦ রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি (১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ):-

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জার্মানি তোষণে ক্ষুদ্ধ ও সন্ত্রস্ত হয়ে রাশিয়া নিজ নিরাপত্তার জন্য শেষ পর্যন্ত জার্মানির সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেয়। হিটলার নিজস্বার্থে এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান এবং ‘রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এতে ৭টি শর্ত ছিল। স্থির হয়, চুক্তিটি ১০ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। একে অপরকে আক্রমণ করবে না। কোনো তৃতীয় শক্তি দ্বারা কেউ আক্রান্ত হলে অন্যজন কঠোর নিরপেক্ষতা রক্ষা করবে। নিজেদের মধ্যেকার বিরোধগুলি আপসে মীমাংসা করবে। এছাড়া এক গোপন শর্ত দ্বারা পূর্ব-ইউরোপকে প্রভাব-বলয়ে বিভক্ত করা হবে বলে স্থির হয়। এই চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ পরিষ্কার করে দেয়।

ইউরোপের ইতিহাসের কয়েকটি সন্ধি

Leave a Reply