ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবে কৃষির অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই অগ্রগতির ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে সমর্থন করে এবং শিল্পায়নের জন্য শ্রমিক সরবরাহ করে। এছাড়াও, নতুন কৃষি কৌশল এবং যন্ত্রপাতি প্রবর্তনের ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে, যা কারখানায় কাজ করার জন্য শ্রমিকদের মুক্ত করে।
ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবে কৃষির অগ্রগতি নিম্নলিখিতভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে:
- খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি:
- কৃষি ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত নতুন কৌশল, যেমন – শস্য আবর্তন পদ্ধতি, উন্নত বীজ এবং সার ব্যবহারের ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।
- শ্রমিক সরবরাহ:কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, কারখানায় কাজ করার জন্য প্রচুর শ্রমিক শহরে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে।
- নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন:কৃষিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং প্রযুক্তি, যেমন – উন্নত লাঙ্গল, বীজ বপন যন্ত্র, ফসল কাটার যন্ত্র ইত্যাদি উদ্ভাবিত হয়, যা উৎপাদনশীলতা আরও বাড়াতে সাহায্য করে।
- পুঁজিবাদী কৃষি:ভূমি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন, যেমন – ঘের প্রথা (enclosure system) এবং বাণিজ্যিক কৃষির প্রসার, কৃষিকে পুঁজিবাদী রূপ দেয়।
- শিল্পায়নের ভিত্তি:কৃষিতে এই পরিবর্তনগুলি শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, যেমন – কাঁচামাল, খাদ্য এবং শ্রমিক সরবরাহ করে শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে।
এইভাবে, ইংল্যান্ডের কৃষি বিপ্লব শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি বা শ্রমিক সরবরাহই করেনি, বরং শিল্প বিপ্লবের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে।
Table of Contents

ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবে কৃষির অগ্রগতি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল?
ভূমিকাঃ
মানুষের কায়িক শ্রমের পরিবর্তে যন্ত্রের সাহায্যে শিল্পের ক্ষেত্রে যে আমূল পরিবর্তন এসেছিল তাহা সাধারণভাবে শিল্পবিপ্লব নামে পরিচিত। সপ্তদশ শতক থেকে ইউরোপে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। এই শিল্পবিপ্লব সর্বপ্রথম ঘটেছিল ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের এই শিল্প-বিপ্লবে কৃষির অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
কৃষির উন্নয়নঃ
একাধিক কারণে অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়।
প্রথমত,
প্রথম থেকে ব্রিটেনের বণিকগণ ইউরোপের অন্যান্য দেশের বণিকগণ অপেক্ষা অধিকতর উদ্যোগী ছিল। একমাত্র ওলন্দাজ বণিকগণই উদ্যোগের ক্ষেত্র ইংরেজ বণিকগণের সমকক্ষ ছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের একাধীক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে হল্যান্ডের ভাগ্য জড়িত হয়ে পড়ার ফলে বণিকগণের কর্মক্ষমতা বহুলাংশে নষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ইংল্যান্ডেই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃষির উন্নয়ন ঘটে। একই জমিতে বিভিন্ন শস্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হলে কৃষির ক্ষেত্রে এক বিরাট বিপ্লব আসে। পতিত জমি উদ্ধার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষেত্র-খামারকে বৃহদাকার ক্ষেত-খামারে পরিণত করা হয়।

কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তনঃ
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইনের দ্বারা বহু উন্মুক্ত জমি ও সাধারণ গোচারণ-ভূমিতে ব্যাপকভাবে চাষ-আবাদ করা শুরু হয়। প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ করে জমির উৎপাদিক শক্তি বৃদ্ধি করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের ফলে ক্ষুদ্র চাষী ও পশুপালকগণ তাদের জীবিকা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের অধিকাংশই শিল্প-শ্রমিকে পরিণত হয়। যন্ত্রশিল্পের প্রসারের ফলে জীবিকাচ্যুত বহু মানুষ গ্রাম থেকে শিল্পের কেন্দ্র-শহরগুলিতে চলে আসতে থাকে।
কৃষি-বিপ্লবঃ
এই সময়ে ইংল্যান্ডে শিল্পের ন্যায় কৃষিরও উন্নতি সাধিত হয়েছিল। পূর্বে একখন্ড জমিতে দু-বছর শস্য উৎপাদন করে তৃতীয় বছর সার সঞ্চিত করার জন্য তা পতিত করে রাখা হত। এই ব্যবস্থায় প্রতি তিন বছরে এক বছরের ফসল নষ্ট হত। এখন জানা গেল যে শিকড় বা মূলের আবাদ করলে ভূমির উর্বরতা নষ্ট না করে ফসল উৎপাদন করা যেতে পারে, অথচ একটি বছরও জমি ফেলে রাখতে হয় না। অধিকন্তু গরু, মোষ প্রভৃতি গৃহপালিত পশু শীতকালে ওই মূল খেয়ে প্রাণ ধারণ করতে পারে। কথিত আছে মন্ত্রী টাউনসেন্ড এই প্রকারে কৃষির উৎকর্ষ সাধনে অগ্রণী হয়েছিলেন। এই সময় বেওয়েল প্রমুখ বৈজ্ঞানিকের প্রচেষ্টায় বিভিন্ন জাতীয় গৃহপালিত পশুর সংমিশ্রণে উন্নত শ্রেণীর গোরু-মোষাদী উৎপাদিত হতে থাকে।

শিল্প-বিপ্লবে কৃষির প্রভাবঃ
পূর্বে দেশের অনেক জমি অকর্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকত। সাধারণ লোকে ওই জমিতে গরু, ভেড়া, মোষ প্রভৃতি পশু চারণ করত। এখন অধিকাং জমিই আবাদ হতে থাকে। বহু অর্থ ব্যয়ে ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে ওই সকল জমি থেক বহু পরিমাণ শস্য উৎপাদিত হতে থাকে। এই সময় জমির উৎপাদন শক্তি প্রায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু কৃষিকার্য ক্রমেই অধিক ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র কৃষকরা ক্রমশ নিঃস্ব ও নিরন্ন হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে অনেকে কল-কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিয়ে অতি কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। এই ব্যবস্থাই ইংল্যান্ডে কৃষিবিপ্লব সংঘঠিত করে ছিল। এই কৃষি-বিপ্লবের হাত ধরেই শিল্প-বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়। ইংল্যান্ডে এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে ওঠে।