ইংল্যান্ডের ইনফরমেশন আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় অবদান

ইংল্যান্ডের ইনফরমেশন আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় অবদান – ইংল্যান্ডের তথ্য আন্দোলনে (information age) রাষ্ট্রের অবদান মূলত পরোক্ষ ছিল, যেখানে সরকার নতুন প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা করেছে, কিন্তু সরাসরিভাবে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়নি। তবে, এই আন্দোলনে সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

আরও জানুন – ভারত বিভাজন

জিওফ্রে এলটনের সঙ্গে তুমিও কি একমত যে ইংল্যান্ডের ইনফরমেশন আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় অবদান কি ছিল ?

• ভূমিকা:-

ইংল্যান্ডের চার্চ কোনদিনই পোপতন্ত্রের নিকট আত্মসমর্পণ করেনি এবং অনেক সময় পোপের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানিয়েছে। রাজা প্রথম এডোয়ার্ড এবং তৃতীয় এডোয়ার্ড পোপের প্রভাব হ্রাস করার জন্য কয়েকটি কঠোর আইন বিধিবদ্ধ করেন। সেজন্য পোপের সাথে ইংল্যান্ডের চার্চের বিচ্ছেদ কোনক্রমেই ইংল্যান্ডের জনসাধারণের কাছে অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়নি। নবজাগরণের যুগে জন কোলেট এবং স্যার টমাস ম্যুরের মতো মানবতাবাদীগণ ধ্রুপদী সাহিত্য এবং নতুন শিক্ষাবিস্তারের আন্দোলনের দ্বারা বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হন এবং তাঁর চার্চ ও রাষ্ট্রের তদানীন্তন শোচনীয় অবস্থার অবসান ঘটিয়ে ব্যাপক সংস্কার সাধনের জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করেন।

• ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কারের বৈশিষ্ট্য:-

ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কার আন্দোলন কোনক্রমেই জাতীয় আন্দোলনের পর্যায়ে পড়ে না। জনসাধারণের পরিবর্তে ইংল্যান্ডের রাজাই এই ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাছাড়া রাজা অষ্টম হেনরী প্রয়োজনের তাগিদে ধর্মসংস্কার কার্যে আত্মনিয়োগ করেননি, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই তিনি সংস্কারে উদ্যোগী হন। ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কারের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল যে, পোপতন্ত্রের প্রাধান্য ধ্বংস করতে তাঁরা আগ্রহী হলেও প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমত গ্রহণের ব্যাপারে তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে রাজার ব্যক্তিগত ইচ্ছাই ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কারের পথ প্রশস্ত করে তোলে।

• অষ্টম হেনরী এবং পোপতন্ত্র:-

সিংহাসন আরোহনের সময় এবং তার বেশ কয়েক বছর পর্যন্তও অষ্টম হেনরীর সাথে পোপের সম্পর্ক অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল। এমনকি মার্টিন লুথার যখন রোমের চার্চের কর্তৃত্বের উপর আক্রমণ শুরু করেন এবং পোপের ক্ষমতা সম্পর্কেও নানারূপ প্রশ্ন উত্থাপন করেন, তখন অষ্টম হেনরী পোপের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং মার্টিন লুথারের কার্যকলাপ ও তাঁর প্রচারপত্রের তীব্র নিন্দা করেন। অষ্টম হেনরীর এই ভূমিকা পোপের কাছ থেকে যথেষ্ট প্রশংসা লাভ করে এবং পোপ তাঁকে ‘ডিফেন্স ও ফেথ’ উপাধীতে ভূষিত করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই ‘বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রশ্ন’-কে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটে।

• বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রশ্ন:-

ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক কারণে রাজা অষ্টম হেনরী তাঁর রানী আরাগণের রাজকুমারী ক্যাথারিনের সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদের জন্য অত্যন্ত আগ্রহান্বিত হয়ে ওঠেন। ক্যাথরিনের গর্ভে কোনো পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ না করায় অষ্টম হেনরী সিংহাসনের উত্তরাধিকারের ব্যাপারে অত্যান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন এবং পুত্রসন্তান লাভকরার জন্য তিনি আবার বিবাহ করতে বাস্ত হয়ে পড়েন। এছাড়া ক্যাথরিন ছিলেন অষ্টম হেনরীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আর্থারের বিধবা স্ত্রী।

              খ্রিঃধর্মের অনুশাসন লঙ্ঘন করে পোপের বিশেষ অনুমতি নিয়ে অষ্টম হেনবীর পিতা সপ্তম হেনরী স্পেনের সাথে স্থায়ী রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এই বিবাহের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু অষ্টম হেনরীর ধারণা হয় যে, খ্রীষ্টিয় অনুশাসন লঙ্গন করার জন্যই ঈশ্বরের দ্বারা অভিশপ্ত এই বিবাহের ফলে তাদের কোনো পুত্রসন্তান হয়নি। এছাড়া এই সময় রাজা অষ্টম হেনরী অ্যান বোলিন নামে এক সুন্দরী রমনীর প্রেমে পতিত হন। সুতরাং অ্যান বোলিনকে বিবাহ করার পূর্বেই ক্যাথরিনের সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেজন্য তিনি পোপ সপ্তম ক্লীমেন্টকে বিবাহ-বিচ্ছেদ সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ জানান। তবে পোপ বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রশ্নটি রোমের ধর্মীয় বিচারালয়ে স্থানান্তরিত করেন।

• ধর্মসংস্কারের বিভিন্ন পদক্ষেপ:-

অষ্টম হেনরী ভীতিপ্রদর্শন করে যাজক সম্প্রদায়কে তাঁর কর্তৃত্বের নিকট আত্ম সমর্পণ করতে বাধ্য করেন। তারপর তিনি পোপের প্রাপ্য অর্থ থেকে তাঁকে বঞ্চিত করে সেই অর্থ রাজার কোষাগারে জমার ব্যবস্থা করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি অ্যানেটস এবং অন্যান্য ধর্ম-সংক্রান্ত কর রোমে পাঠাবার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিছুদিন পর অ্যাক্ট অব অ্যাপীলস আইন অনুসারে পোপের বিচারালয়ে বিচারপ্রার্থী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অষ্টম হেনরী গৃহীত এইসব ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ইংল্যান্ডের কোনো ব্যাপারে পোপের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার জন্য প্রত্যক্ষ ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। ১৫৩৩ খ্রিঃ বিবাহ-বিচ্ছেদ হওয়ার পর অষ্টম হেনরী অ্যান বোলিনকে বিবাহ করেন।

• হেনরীর ধর্মীয় নীতি:-

ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কারের প্রাথমিক পর্যায় শেষ হওয়ার পর অষ্টম হেনরী ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন সাধন করেন তার ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। ল্যাটিন ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বাইবেল ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায়শ্চিত্তকরণ, মুক্তিপত্র ক্রয়-বিক্রয়, যীশুখ্রীষ্টের শেষ ভোজোৎসবের সমবেত অনুষ্ঠান প্রভৃতি পদ্ধতিকে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয় এবং তাহা বন্ধ করে দেওয়া হয়। মূর্তি ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তীর্থ যাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু অষ্টম হেনরী গৃহীত ব্যবস্থার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল দূর্নীতির জন্য ধর্মীয় মঠগুলো ধ্বংস করার ব্যবস্থা।

• ষষ্ঠ এডোয়ার্ডের আমলে ধর্মসংস্কার:-

নাবালক ষষ্ঠ এডোয়ার্ডের রাজত্বকালে তাঁর খুল্লতাত ডিউক অফ সমারসেট তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন। তিনি ইংল্যান্ডকে পুরোপুরিভাবে প্রোটেস্ট্যান্ট দেশে পরিণত করার জন্য কয়েকটি সংস্কার প্রবর্তন করেন। যীশুখ্রীষ্টের নৈশ ভোজোৎসব পালন বন্ধ করেন, চিত্র এবং মূর্তিসমূহ চার্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ল্যাটিন ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় লিখিত ‘বুক অফ কমন প্রেয়ার’ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। ‘ধর্মের বিয়াল্লিশটি ধারা’ নামে পরিচিত একটি নতুন ধর্মবিশ্বাসের স্বীকারোক্তি প্রচার করা হয়। এর মধ্যে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মবিশ্বাসের মূল বক্তব্য সঙ্কলন করা হয়। ষষ্ঠ এডোয়ার্ডের সময়েই ইংল্যান্ড পুরোপুরি সংস্কারপন্থী মতাবলম্বীদের দেশে পরিণত হয়।

• ক্যাথলিকদের প্রতিক্রিয়া:-

ষষ্ঠ এডোয়ার্ডের অকাল-মৃত্যুর পর অষ্টম হেনরীর প্রথমা কন্যা মেরী ইংল্যান্ডের সিংহাসন লাভ করেন। তিনি ছিলেন রানী ক্যাথরিনের সন্তান এবং স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের স্ত্রী। তিনি ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক এবং সিংহাসনে আরোহনের পরই তিনি ক্যাথলিক ধর্ম পুনঃ প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করেন। তিনি পোপের আনুগত্য স্বীকার করেন এবং নির্মম নীতির দ্বারা রোমের পোপের প্রতি ইংল্যান্ডের জনসাধারণের আনুগত্য আদায় করার চেষ্টা করেন। ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী বহু নাগরিককে ধর্মীয় মতবাদের জন্য তিনি অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করেন।

• এলিজাবেথের নীতি:-

রানী মেরীর মৃত্যুর পর অষ্টম হেনরী ও অ্যান বোলিনের কন্যা এলিজাবেথ ইংল্যান্ডের সিংহাসন লাভ করেন। তাঁর পূর্বসূরীদের ধর্মীয় নীতির ব্যাপারে ব্যর্থতা তাঁকে এই ব্যাপারে যথেষ্ঠ সতর্ক করে তোলে। ষষ্ঠ এডোয়ার্ড এবং রানী মেরীর ধর্মীয় ব্যাপারে চরম নীতিই ছিল তাঁদের ব্যর্থতার প্রধান কারন। সুতরাং উভয়পক্ষের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য একটি নরমপন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করেন। যদিও উভয়পক্ষের চরমপন্থীগণ এলিজাবেথের নীতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা এলিজাবেথের নীতির সারবত্তা স্বীকার করতে বাধ্য হন।

• জিওফ্রি এলটনের মতবাদ:-

এলটনের মতে, ইংল্যান্ডের মঠগুলি ভেঙে দেওয়ায় পোপের প্রভাব প্রতিপত্তির শেষ অংশটিও নস্যাৎ হয়ে যায়। বরং রাজকোষ বৃদ্ধি পায় এবং এক নতুন জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হয় এই বিশাল জমির সম্পত্তির বেচা-কেনাকে কেন্দ্র করে। এই বক্তব্য থেকে ইংল্যান্ডের ওপর মঠের বিলুপ্তির প্রভাব সহজেই অনুমান করা যায়–

প্রথমত:-

ধর্মের দিক থেকে এলটনের ভাষায়, এর ফলে বহুদিনের প্রচলিত একটি ধর্ম অর্থাৎ ক্যাথলিক ধর্মের সাময়িক অবসান হয় এবং প্রচেস্ট্যান্ট ধর্মের উত্থান ত্বরান্বিত হয়।

দ্বিতীয়ত:-

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে রাজা ও রাষ্ট্রের অবস্থা অনেকবেশী শক্তিশালী হয়। তবে এই সাথে একটা বিরাট অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা হয়, সেই সাথে দেখা দেয় সামাজিক বিপ্লব।

মূল্যায়ন –

          সুতরাং জিওফ্রি এলটনকে অনুসরণ করে বলা যায়, ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কার আন্দোলন ছিল একটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ বিশেষ। এখানে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় উন্নতি কল্পেই মঠগুলি ধুৎস করে ধর্মসংস্কার আন্দোলন করা হয়েছিল।

ইংল্যান্ডের ইনফরমেশন আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় অবদান

Leave a Reply