অসহযোগ আন্দোলনে পটভূমি ব্যাখ্যা করো – ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হল অসহযোগ আন্দোলন। এই আন্দোলনের সুবাদেই দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর কংগ্রেস ‘রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি’ ছেড়ে সরাসরি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা আচার্য জে. বি. কপালনি বলেছেন-অসহযোগ আন্দোলন কংগ্রেস ও জাতীয় ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করে (“This opened a new chapter in the history of the Congress and the nation”)
অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি ছিল মূলত ব্রিটিশ শাসনবিরোধী ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, এবং খিলাফত সমস্যার কারণে। মহাত্মা গান্ধী এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং স্বরাজ অর্জনের লক্ষ্যে একটি ব্যাপক অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনকে অচল করে দেওয়া এবং ভারতীয়দের মাধ্যমে স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
Table of Contents
READ MORE – 1942 সালের আগস্ট আন্দোলনের গুরুত্ব
অসহযোগ আন্দোলনে পটভূমি ব্যাখ্যা করো

পটভূমি:
অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়-
স্বায়ত্তশাসন অর্জনে ব্যর্থতা:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশের স্বায়ত্তশাসন দান প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে যুদ্ধ তহবিল গঠনের লক্ষ্যে ভারতবাসী ৬ কোটি ২১ লক্ষ পাউন্ড চাঁদা দেয়) প্রায় সাড়ে বারো লক্ষ ভারতীয় সেনা ইংরেজদের হয়ে বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়, বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রায় ১০ হাজার ভারতীয় সেনা আত্মবিসর্জন দেয়। কিন্তু ব্রিটিশ ইংরেজদের হাতিয়ার ফলে আশাহত ও ক্ষুদ্ধ ভারতবাসী এক গণ আন্দোলনের পথে শামিল হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দেবে, কিন্তু যুদ্ধের পর তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় ভারতীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
আর্থিক সমস্যা:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের দাম- বহুগুণ বেড়ে যায়। (১৯১১ খ্রিস্টাব্দে একজোড়া ধুতির দাম ছিল যেখানে এক টাকা বারো আনা, সেখানে ছয় বছর পর তার দাম বেড়ে হয় ছয় টাকা। মোটা চাল, গম, বাজরা, লবণ, কেরোসিন, কাপড় প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় তার সুযোগ নেয় ফাটকাবাজ ও কালোবাজারিরা। এই আর্থিক সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ভারতবাসী আন্দোলনের তাগিদ অনুভব করে ও কুখ্যাত রাওলাট আইন: ব্রিটিশ সরকার কুখ্যাত রাওলাট আইন পাস (১৯১৯ খ্রি., ১৮ মার্চ) করে ভারতবাসীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল।
রাওলাট আইনের প্রতিবাদেই গান্ধিজি সত্যাগ্রহের ডাক দেন। যার পরিণতিতে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মতো নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে।) এই আইন যে অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি রচনায় সাহায্য করেছিল সে কথা মেনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘A Nation in Making’ গ্রন্থে বলেছেন-রাওলাট আইন ছিল অসহযোগ আন্দোলনের জনক (“The Rowlatt Act was the parent of the Non-co-operation Movement”)।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড:
কুখ্যাত রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক এক উদ্দ্যানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেনারেল ডায়ার ও তার নিষ্ঠর সেনাবাহিনী হঠাৎ সেখানে হাজির হয়ে সমাবেশে উপস্থিত নিরীহ মানুষদের ওপর ১৬০০ রাউন্ড গুলি চালায়। এতে সরকারি হিসেবে ৩৭৯ জন নিহত ও ১২০০ জন আহত হয়। ব্রিটিশের এই ঘৃণ্য কাজের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ঘৃণাভরে ত্যাগ করেন গান্ধিজি ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লেখেন-এই শয়তান সরকারের সংশোধন অসম্ভব, একে ধ্বংস করতেই হবে (“This satanic government cannot be mended, it must be ended”)।
মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার (Montagu-Chelmsford Reforms):
১৯১৯ সালের এই সংস্কার আইনটি ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। এতে জনগণের মধ্যে আরও হতাশা বাড়ে।

খিলাফৎ সমস্যা:
গান্ধিজি চেয়েছিলেন খিলাফৎ সমস্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। এতে একদিকে যেমন ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয় আন্দোলন শক্তিশালী ও তদ্র হয়ে উঠবে, অপরদিকে তেমন ব্রিটিশ সরকারের হিন্দু-মুসলিম বিভেদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। গান্ধিজি মনে করতেন-খিলাফৎ ও অসহযোগের মিলনে ব্রিটিশ প্রশাসনকে জোর ধাক্কা দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেছিলেন-হিন্দু-মুসলিম ঐকোর এমন সুযোগ একশো বছরেও আর আসবে না। তাই তিনি কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি ও ইসলামের আবেগকে মিশিয়ে এক সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় গান্ধিজি লেখেন-আমরা যদি নিজেদের একটি জাতি বলে বিশ্বাস করি, তাহলে আমরা অবশ্যই সকল সহযোগিতা প্রত্যাহার করে সরকাররে বিব্রত করব।
শ্রমিকদের দুর্দশা:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যাপকভাবে শিল্প কারখানাগুলিতে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। এমনিতেই শ্রমিকদের কম মজুরি, বাসস্থানের অভাব, কাজের সময়সীমা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ইত্যাদি ব্যাপারে ক্ষোঃ ছিল। এর ওপর শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হলে তারা ধর্মঘট করে। সুমিত সরকারের মতে-অসহযোগ চলাকালীন মোট ৪০০টি শ্রমিক ধর্মঘট হয়। জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম শতকরা ১০০ ভাগ বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি শতকর ১৫ ভাগের বেশি বাড়েনি। রজনী পামদত্ত ‘ইন্ডিয়া টুডে’ গ্রন্থে বলেছেন- দেশের মধ্যে কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণির অসন্তোষ দিনের পর দিন বাড়ার ফলে কংগ্রেসের পক্ষে আর সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। ঐতিহাসিক গজেন্দ্র রাণাডে বলেছেন-শ্রমিকরা গান্ধিজির সহায় থাকার জন্য আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কৃষকদের দুরবস্থা:
ভূমিরাজস্বের হার বৃদ্ধির জন্য সব থেকে বেশি মাশুল দিতে হয় কৃষক সম্প্রদায়কে। কৃষিজাত পণ্যের দাম না বাড়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রয় করে লাভ পেত না। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের অত্যন্ত কম দামে মহাজনদের কাছে কৃষিজাত দ্রব্য বিক্রয় করতে হত, কিন্তু বেশি দাম দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় এব কিনতে হত। ফলে কৃষক সম্প্রদায়ের মনে অসন্তোষ দানা বাঁধে, যা তারা উগরে দিতে চায় এক গণ আন্দোলনের মাধ্যমে) লুই ফিশার তাঁর ‘The Life of Mahatma Gandhi’ গ্রন্থে লেখেন-রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে চাষিরা পর্যন্ত যুদ্ধে ভারতীয়দের রক্তপাতের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন।
জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ:
ভারতের অর্থনৈতিক শোষণ এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
দেশীয় শিল্পোদ্যোগে বাধা:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অর্থসংকট তীব্র হওয়ায় আমজনতার পক্ষে শিল্পজাত পণ্য কেনার ক্ষমতা কমে যায়। এ সময় নানা কারণে দেশীয় শিল্পক্ষেত্রগুলিতে মন্দা দেখা দেয়। যুদ্ধের পর থেকেই ব্রিটিশ সরকার দেশীয় শিল্পোদ্যোগকে ধ্বংস করার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে। দেখা যায় তৎকালীন ভারত-সচিব মর্লে মাদ্রাজে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পোদ্যোগকে আটকানোর গোপন নির্দেশ দেন বা ভদ্রাবতী লৌহ প্রকল্প ও কৃয়সার সাগর বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনা রূপায়ণে নিয়োজিত বিশ্বেশ্বরাইয়া (মহীশূরের দেওয়ান)-কে পদচ্যুত করা হয়।
সমকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি:
সমকালীন আন্তর্জাতিক আঙিনায় রুশ বিপ্লব, আয়াল্যান্ডে মাইকেল কলিন্সের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ, ডি. ডেলেরার সিনফিন আন্দোলন, জগলুল পাশার নেতৃত্বে মিশরে তীব্র ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন, তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে গণসংগ্রাম ভারতের কংগ্রেসি শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে উদ্বুদ্ধ করে। মন্টো চেম্সফোর্ড রিপোর্টে বলা হয়-রুশ বিপ্লব স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক বিজয়রূপেই চিহ্নিত হয়েছিল-এটি ভারতের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
স্বরাজের দাবি:
এই সমস্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, স্বরাজ (স্ব-শাসন) অর্জনের দাবি আরও জোরদার হয়, এবং গান্ধীজি এটিকে আন্দোলনের একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্যবস্তু করেন।
মূল্যায়নঃ
এই প্রেক্ষাপটে, গান্ধীজি ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে অসহযোগের প্রচার গ্রহণ করতে রাজি করান। এই আন্দোলন ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলিকে বয়কট, সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থা বর্জনের মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার একটি অহিংস পদ্ধতি ছিল।